ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
১৮ দলীয় জোটের ডাকে ৭১ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। জনতার অবরোধে অচল দেশ। অবরোধের তৃতীয় দিনে পুলিশ ছিল মারমুখী। জনতার উদ্দেশে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলী, টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। পুলিশী নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি মহিলারাও। নোয়াখালীতে পুলিশ ১৮ দলের নেতাকর্মীদের ওপর তিনশতাধিক রাউন্ড গুলীবর্ষণ করেছে। পুলিশের গুলীতে শতাধিক লোক আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া পটুয়াখালীতে ১৮ জন, ময়মনসিংহে ১১ জন, কুমিল্লায় ১০ জন, সিলেটে ২০ জন, নারায়ণগঞ্জে ১৮ জন, ঢাকায় ৩০ জনসহ সারাদেশে শত শত মানুষ গুলীবিদ্ধ হয়েছে।
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, দিনাজপুরে ১৮ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দসহ শতশত লোক আহত হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি’র গুলী হত্যা নির্যাতন যত বাড়ছে মানুষ ততই ফুঁসে উঠছে। আন্দোলন বিস্তৃত হচ্ছে। সর্বাত্মক অবরোধে অচল হয়ে পরে গোটা দেশ। জনজীবন হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। পুলিশের মারমুখি আচরণ, সরকারি দলের সন্ত্রাসের মাঝেও জনতা নেমে এসেছে রাজপথে। অবরোধ করে রাজপথ, রেলপথ। বন্ধ ছিল নৌ চলাচল।
গত সোমবার সন্ধ্যায় নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বৃস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি দেয় ১৮ দলীয় জোট। গত বুধবার অবরোধ কর্মসূচি আরো ২৩ ঘণ্টা বাড়িয়ে আজ শুক্রবার সকাল ৫টা পর্যন্ত করা হয়।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গত ২৫ নবেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের ৯ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে এক হাজার দুইশ’ এর অধিক নেতা-কর্মী। আহত ৩২০০ জনের অধিক নেতা-কর্মী। মামলায় আসামী করা হয়েছে ১৬ হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে।
অবরোধের প্রথম দিন সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে কুমিল্লায় এক বিজিবি সদস্যসহ ২ জন, সাতক্ষীরা সরকার দলীয় দুই নেতা, বগুড়ায় যুবদল কর্মী, সিরাজগঞ্জ যুবদল নেতা ও ফেনীতে ১ সিএনজি অটোরিকশা চালক নিহত হন। দ্বিতীয় দিন সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে চট্টগ্রামে এক যুবদল নেতাসহ ৩ জন, সাতক্ষীরায় জামায়াত নেতাসহ ২ জন, সিরাজগঞ্জে জামায়াত ও ছাত্রদলের ২ জন ও গাজীপুরে এক আওয়ামী লীগ নেতা ও যশোরে জামায়াত নেতা নিহত হন। এছাড়া রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণে আহত আনোয়ারা বেগম ও মোজাম্মেল হক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হলে গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন অন্তত ১৯ যাত্রী। গুরুতর আহতদের মধ্যে নাহিদ নামে এক যুবক রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
অন্যদিকে রাতে নরসিংদীর ঘোড়াশালে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে ২ ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হয়েছেন। অবরোধের প্রথম দিন কক্সবাজারের চকোরিয়ায় গ্রেপ্তার যুবদলের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল হালিম গতকাল জামিনে মুক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরিবারের দাবি, আটক অবস্থায় পুলিশি নির্যাতনে অসুস্থ হওয়ায় তাকে জামিন দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হলে সেখানেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এদিকে বিরোধী দল বিএনপি দাবি করেছে, অবরোধের তিন দিনে ১৮ দলের মোট ৯ জন নিহত, ৩২০০ আহত হয়েছে।
অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রি. (অব.) আসম হান্নান শাহ, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মীর নাছির ও সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খন্দকারসহ তিন দিনে ১২০০ গ্রেপ্তার, ১৬ হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে মামলায় আসামি ও ২২ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দিয়েছে।
অবরোধ কর্মসূচিতে রাজপথে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন রাজশাহী সিটির মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনার মনিরুজ্জামান মনি ও কুমিল্লার মনিরুল হক সাক্কু। এছাড়া রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে একাধিক মামলা।
অবরোধের শেষ দিনেও রেল লাইন উৎপাটনের ঘটনা ঘটেছে বগুড়া, কুমিল্লা ও নওগাঁয়। ফলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে রাজধানী থেকে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পড়ে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে। বন্ধ ছিল রাজধানীর সঙ্গে দূরপাল্লার বাস চলাচল। বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটেছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, পটুয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, সাভার, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বরিশাল, গাজীপুরসহ অন্তত ২০ জেলায়।
অবরোধে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে আগামী রোববার রাজশাহীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে স্থানীয় বিএনপি। এদিকে নাশকতা ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিটি অলিগলিতে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের। রাতভর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে টহল দিয়েছে বিজিবি। জলকামান ও রায়ট কার নিয়ে পুলিশ টহল দেয় রাজপথে। আতঙ্কিত মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হননি।




