শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়হরতালে চট্টগ্রামে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা

হরতালে চট্টগ্রামে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা

চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ৬০ ঘন্টার হরতালে চট্টগ্রামে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। স্থবির ছিল দেশের সর্ববৃহৎ ভোগ্য পণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জ। বন্দরে পণ্য উঠানো নামানো থাকলেও বন্ধ ছিল পণ্য পরিবহন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, তিন দিনের হরতালে চট্টগ্রামে দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পোশাক শিল্পে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ীরা আলোচনার মাধ্যমে দেশের এ অবস্থার অবসান চান।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মাহবুবুল আলম  বলেন, ‘এ মাসে ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে ১৪দিনই ব্যাংক বন্ধ ছিল। ৭দিন ঈদের বন্ধ ছিল, চারদিন শুক্রবার ও তিনদিন হরতাল। এ অবস্থা যদি হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা কিভাবে ব্যবসা করবে। তিন দিনের হরতালে চট্টগ্রামে প্রায় দেড়হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বন্দরে যদি পণ্য নিয়ে জাহাজ বসে থাকে তাহলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে। ব্যাংককে সুদ দিতে হবে। হরতাল শুধু ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্থ করছে না। দেশের অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর জন্য ভোক্তাদেরও ভুক্তভোগী হতে হয়।’

দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুন গঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরতালের প্রথম দিন রোববার থেকে খাতুনগঞ্জের প্রায় তিন হাজার দোকানের মধ্যে বেশিরভাগই বন্ধ ছিল। যেসব দোকান খোলা ছিল সেগুলোতে ক্রেতার দেখা মেলেনি। কিছু দোকানে অর্ডার থাকলেও পণ্য সরবরাহ করা যায়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হরতালে খুচরা বাজারে পণ্যের সরবরাহ না থাকায় বিভিন্ন ভোগ্য পণ্যের দাম তিনদিনে কয়েকগুন বেড়ে গেছে।

খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্যের(পেঁয়াজ রসুন আদা) পাইকারি বাজার হামিদউল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘প্রতিদিন ৪০০-৫০০টন পেঁয়াজ বেচাকেনা হতো। হরতালে বেচাকেনা হয়নি বললেই চলে। এসব কাঁচা পণ্যে দ্রুত পচন ধরে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও শঙ্কিত।’

চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল হক  বলেন,‘স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টন চাল বিক্রি হয়। প্রতি দোকানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। কিন্তু এবারের হরতালে কোন বেচাকেনা হয়নি।’

পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। তবে টানা তিনদিনের হরতালের গড়ে ১০ হাজার টাকার বিক্রিও হয়নি। আগের হরতালগুলোতে দূরপাল্লার ক্রেতারা না আসলেও অন্তত কাছের জেলা-উপজেলা থেকে ক্রেতারা বাজারে আসতো। কিন্তু গত দু’দিনে তেমন কোন ক্রেতার দেখাও মেলেনি।’ খাতুনগঞ্জের ডাল ব্যবসায়ী মীর মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘দিনে যেখানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো হরতালে ১লাখ টাকার পন্যও বিক্রি করতে পারিনি।’

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল হোসেন বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে তিনদিনের হরতালে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্ঠি হয়েছে। কোন বেচা কেনা নেই। আতঙ্কে অনেকে দোকানও খুলেনি। আগে যেখানে দিনে ৬০০-৭০০কোটি টাকার লেনদেন হতো সেখানে ২০ শতাংশ লেনদেনও হয়নি। অর্ডার থাকলেও পণ্য সরবরাহ করতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। পূর্বের হরতালে রাতে পণ্য পরিবহন করতে রাজী হলেও সাতকানিয়ায় পিকেটারদের ধাওয়ায় ট্রাক চালক নিহত হওয়ার পর চালকরা আর হরতালে পণ্য পরিবহন করতে রাজি না।’

এদিকে তিনদিনের হরতালে পোশাক শিল্পে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। হরতালে শ্রমিকরা কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারা ও অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ঠদের।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি’র (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘হরতালের পোশাক শিল্পের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে হরতালে আর্থিকভাবে প্রচুর ক্ষতি হয়। পোশাক শিফমেন্ট করা যায় না। অর্ডার ঠিক সময়ে সরবরাহ করা না গেলে বাতিল হয়ে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের বাজার থেকে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিবে ও পোশাক শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।’ তিনি বলেন,‘বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে সাধারণ মানুষের স্বার্থে হলেও এ অবস্থার উত্তরণ ঘটানো প্রয়োজন।’

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘দু’নেত্রীর কাছে আমাদের আবেদন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প যদি হোঁচট খায় তাহলে দেশের অর্থনীতিও চরম সংকটে পড়বে৷ এটা আপনাদের ভাবা উচিত৷ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এধরণের ধ্বংসাত্মক কর্মসুচী থেকে রাজনীতিবিদদের সরে আসতে হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ