ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে শুরু। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় পৌনে আট বছর। এই সময়ে অনেকটাই বিপর্যস্ত, ছন্নছাড়া দশা হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পরিবারের। প্রায় ছয় বছর ধরে জিয়ার দুই সন্তান দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান বিদেশে নির্বাসিত জীবন পার করছেন। আর সন্তান-স্বজনদের ছেড়ে দেশে একাকি জীবন পার করছেন তাদের ৬৯ বছর বয়সী মা বেগম খালেদা জিয়া।
রাজনৈতিক বৈরি পরিস্থিতির কারণে পরিবারটি একে একে ১৪টি ঈদ কাটালো নিরানন্দ আর মন খারাপের মধ্য দিয়ে। এই নিরানন্দ কি টানা বিচ্ছিন্নতার কারণে? নাকি দুর্দশাও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে পরিবারটিকে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, আগে ঈদুল আজহায় হলেও এবার বগুড়ার গাবতলীতে জিয়ার গ্রামের বাড়িতে কোরবানি হয়নি। তবে সেনানিবাসের জিয়ার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর খালেদা গুলশানের যে বাসায় ভাড়াটে হয়েছেন সেখানে একটি গরু কোরবানি হয়েছে।
গ্রামের বাড়িতে কোরবানি না হওয়ার কারণ জানতে গিয়ে পাওয়া গেল সহজ কার্যকারণ। জিয়া পরিবারের ঈদ থেকে শুরু করে সব উৎসবের আয়োজনগুলো পরিবারের বড় সন্তান তারেক রহমান তত্ত্বাবধায়ন করতেন। ২০০৭ এর ৭ মার্চ রাতে গ্রেফতার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর লন্ডনে চিকিৎসার জন্য পাঁচ বছরের যাপিত জীবনে তিনি আর তত্ত্বাবধায়ন করতে পারছেন না।
তারেকের অনুপস্থিতিতে ঢাকায় মা খালেদার সংসার ও রাজনীতি দেখছেন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী আর দলীয় নেতারা। কিন্তু গ্রামের বাড়িতের তারেকের চাচা আহসানুল হক তালুকদার রতনসহ অন্যদের দেখভালে বগুড়ার বিএনপি নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হলেও তারা এ দায়িত্ব পালন করছেন না।
জেলার বিএনপি নেতাদের দায়িত্বহীনতার কারণে যে জিয়ার গ্রামের বাড়িতে কোরবানি হয়নি তা জানা গেল রতনের কাছ থেকে। তিনি জানালেন, ‘প্রতি বছর এই বাড়িতে কোরবানি দেয়া হয়, কিন্তু এবার হয়নি।’
আর বগুড়া জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মাহফুজুর রহমান জানালেন, ‘জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম এবার খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে একটি গরু কোরবানি দিয়েছেন।’
সাইফুলের বাড়িতে গরুটি কোরবানি হয়েছে জানিয়ে জিয়ার বাড়িতে কোরবানি না হওয়ার কথা নিশ্চিত করে মাহফুজুর জানালেন, ‘খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে বগুড়ায় আর কোনো কোরবানি হয়নি।’ তবে খালেদার প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান জানালেন, ‘চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসায় একটি গরু কোরবানি দেয়া হয়েছে।’
এদিকে সময়ের আবতর্নে স্বামীহারা, সন্তান বিচ্ছিন্ন প্রবীণ নারী খালেদার জীবনে আজ এসেছিল জীবনের ১৩৮তম ঈদ। আজ বুধবারের এ ঈদটি হলো ঈদুল আজহা। কিন্তু বিগত দিনের টানা ১৩টি ঈদের ধারাবাহিকতায় এবারও নিরানন্দেই কেটেছে তার ঈদ।
খালেদার নিরানন্দ ঈদে বেদনার ছাপ কতোখানি গভীর বুঝা যায় তার সংগ্রামী জীবনকে দেখলে। ৩২ বছর বছর আগে সেনাবাহিনীর একদল ঘাতক সদস্যের হাতে নিহত হন স্বামী জিয়া। এরপর পরিবারের ও তার রাজনৈতিক দলের হাল ধরেন গৃহবধু খালেদা জিয়া।
সংগ্রামী জীবনে খালেদা স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আপোষহীন লড়াইয়ে গণতন্ত্র পুনুরদ্ধারের রাজনীতিতে সফলতা পেয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধামন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরপর আরো দুই বার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজণৈতিক নেতা হওয়ার কারণে তিনি প্রতিনিয়ত নেতা-কর্মী আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ন। দলে নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভাকাক্সিক্ষর অভাব নেই। দেশজুড়ে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসাও তার জন্য। যেখানেই যান সেখানেই ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত তিনি। এতো কিছুর পরও কোথাও যেন একটা শূন্যতা বিরাজ করছে।
কোটি কোটি মানুষের নেতার পাশাপাশি তিনি একজন মাতাও। তাইতো সন্তানদের জন্য তার অপেক্ষা। কিন্তু নিজ সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতনীদের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েই গুলশানের ভাড়া বাসায় কাটলো তার ঈদুল আজহার দিন।
ঈদের দিন ফজরের নামায শেষে তিনি আত্মীয়স্বজনদের সাথে ঈদের প্রথম কুশলাদি বিনিময় করেন। এরপর বিদেশে চিকিৎসার জন্য অবস্থানরত দুই সন্তান, ছেলের বউ ও নাতনীদের সাথে টেলিফোনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এসময় ঈদের দিনেও তিন নাতনী জাইমা রহমান, জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানকে পাশে না থাকায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও দুই পুত্রবধু ডা. জোবাইদা রহমান ও শর্মিলা রহমানের সাথে খালেদার বউ-শাশুড়ির চিরন্তন হৃদ্যতার সম্পর্ক। তাদের পাশে না পাওয়ার বেদনার কখাও ব্যক্ত করেন তিনি।
দূর দেশে থাকা পরিবারে সদস্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়েল পর খালেদা সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলানগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক ও কূটনীতিকদের সাথে ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর চন্দ্রিমা উদ্যানে মরহুম স্বামীর কবর জেয়ারত করে বাসায় ফেরেন তিনি।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বাসায় ফেরার পর ছোট ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্য ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন খালেদা জিয়া।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। এর আগে একই বছরের শুরুর দিকে তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেফতার হন।
৩৭২ দিন সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে আটক থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এর মধ্যে ২০০৭ সালের দু’টি ঈদ কারাগারে কেটেছে তার।
পরে তারেক রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। তিনি এখন সেখানেই আছেন। সাথে আছেন স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। আরাফাত রহমান কোকোও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে থাইল্যান্ড যান। তার স্ত্রী শর্মিলা রহমান, দুই মেয়ে জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানও আছেন তার সাথে।
তাই ২০০৭ সালের পর থেকে দুই ছেলেকে একসঙ্গে পাশে পাননি বেগম জিয়া। বরং পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতনীদের রেখে ১৩টি ঈদ একাই কাটিয়েছেন তিনি। এবার ১৪তম ঈদ একাই পার করলেন বেগম খালেদা জিয়া।




