আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, স্থানীয় বাজারের অসম প্রতিযোগিতা ও উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতার অভাবে লোকসানে পড়েন চট্টগ্রামে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্রেডিং খাত, অর্থাৎ ভোগ্যপণ্য (গম, খাদ্যদ্রব্য, ভোজ্যতেল ও রিফাইনারি) আমদানিকারক, জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ফলে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি হয়ে পড়েন এসব ব্যবসায়ী। এ কারণে গত এক দশকে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে হয় তাদের। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চান চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা। এর মাধ্যমে পূর্ণোদ্যমে ব্যবসায় ফিরে আসার আশা সঞ্চার হয়েছে তাদের মধ্যে।
সূত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগ ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট-সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করে। এ নীতিমালার আওতায় স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দ মানের ঋণখেলাপিরা বিশেষ সুবিধা পাবেন। পুনঃতফসিলের পর ঋণখেলাপিরা নিতে পারবেন নতুন ঋণও। এসব সুযোগ-সুবিধা পেতে ৯০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, খেলাপিরা দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল সুবিধা পাবেন। কেস টু কেস বিবেচনায় ঋণ পরিশোধে এক বছরের জন্য গ্রেস পিরিয়ডও পাওয়া যাবে। অর্থাৎ প্রথম এক বছরে খেলাপিদের ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। মওকুফ হবে অনারোপিত সুদের সম্পূর্ণ অংশ ও ইন্টারেস্ট সাসপেন্সেস হিসাবে রক্ষিত সুদও। তবে মওকুফ করা সুদ প্রাথমিকভাবে পৃথক ব্লক হিসাবে (সুদবিহীন) স্থানান্তর করতে হবে। পুনঃতফসিলের শর্তানুযায়ী সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের পর ব্লক হিসাবে রক্ষিত সুদ চূড়ান্ত মওকুফ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জারীকৃত নীতিমালায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন ট্রেডিং (গম, খাদ্যদ্রব্য, ভোজ্যতেল ও রিফাইনারি), জাহাজশিল্প, লোহা ও ইস্পাতশিল্প খাতের ঋণখেলাপিরা। এসব খাতের খেলাপি গ্রাহকরা সরাসরি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবেন। অন্য খাতের ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল সুবিধা পেতে ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি খেলাপিদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত করা হবে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলেন, নিয়ন্ত্রণ-অযোগ্য বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। এ সংকট থেকে উত্তরণ ও শিল্প-বাণিজ্য-উৎপাদনশীল খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ বজায় রাখতে নীতিমালাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগ্রুপ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপির পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নুরজাহান গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, এসএ গ্রুপের সাড়ে তিন হাজার কোটি, মোস্তফা গ্রুপের আড়াই হাজার কোটি, রাইজিং গ্রুপের এক হাজার ২০০ কোটি, এমইবি গ্রুপের এক হাজার ২০০ কোটি, ক্রিস্টাল গ্রুপের এক হাজার কোটি, সিলভিয়া গ্রুপের এক হাজার কোটি, মাবিয়া গ্রুপের এক হাজার কোটি, বাগদাদ গ্রুপের ৬০০ কোটি, ইয়াসির গ্রুপের ৬০০ কোটি, বাদশা গ্রুপের ৫০০ কোটি, পাকিজা গ্রুপ ৫০০ কোটি, হালদা গ্রুপের ৪০০ কোটি ও লিজেন্ড গ্রুপের ৪০০ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া একক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মেসার্স কোস্টাল ফুডস, মেসার্স পিকে করপোরেশন, এম আর শিপিং লাইসন, মেসার্স সায়মন পেপারস হাউজ, ট্রেডমার্ক, ওয়ান ফ্যাশন ডাবল ক্লিক ডটকম, ছগির অ্যান্ড ব্রাদার্স, মনষা স্টোর, মেসার্স এসএম করপোরেশন, মেসার্স আবেদন ট্রেক্সটাইল মিল, বনলতা গ্রুপের মালিকাধান প্রিটি অ্যাপারেল ও বনবীথি ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড, বেস্ট ফ্যাশন প্রাইভেট লিমিটেড, জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান এসকে শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড স্টিল লিমিটেড, গাউসিয়া ক্রোকারিজ, অটো এসি পার্টস, লোটাস এন্টারপ্রাইস, জম জম স্টোর, মেসার্স আলম স্টোর, প্যারাগন অপু অটো বিক্রস, রুবাইয়া প্লাস্টিক ইন্ডাস্টিজ, মেসার্স মিশম্যাক শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ, নাইট ফ্র্যাঙ্ক ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, মেসার্স এ জামাল অ্যান্ড ব্রাদার্স, চয়েস গার্মেন্ট, মিশমেক ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, শাহেদ শিপ ব্রেকিং লিমিটেড, শাহ আমানত আয়রন, এ মেরিন টেকনিক্যাল সার্ভিসেস, আরাজ গার্মেন্ট, সুলতানা শিপ ব্রেকিং লিমিটেড, লার্ক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড, অপূর্ব ফ্যাশন, মাবিয়া শিপ ব্রেকিং লিমিটেড, জাহিদ এন্টারপ্রাইজ, টেকনো বিল্ডার্স, সী টেক্স, বেনজা স্টিল, ম্যাক ইন্টারন্যাশনালসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে পড়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিমালা জারির পর থেকে ব্যবসায় সক্রিয় ও ঋণ নিয়মিতকরণে আগ্রহ প্রকাশ করেন চট্টগ্রামের একাধিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। চট্টগ্রামের বেশ কয়েক শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুযোগ। এ সুযোগ অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। তবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য নতুনভাবে ঋণ সুবিধা দিতে হবে। প্রয়োজনে বন্ধকি সম্পর্ত্তি দ্বিগুণ নিতে পারে। তা না হলে ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের জন্য কঠিন হবে।
এ বিষয়ে নুরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহম্মদ রতন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সার্কুলার আবারও আমাদের ব্যবসায় ফিরে আসার একটা সুয়োগ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে আমরা ব্যাংকে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করেছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক দরপতনের কারণে সেই সময়ে আমরা ব্যবসায় লোকসান করি। ফলে নিয়মিত পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এ সুযোগে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করা হবে।
অপরদিকে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অনেক দেনদরবার করে ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা নিয়েছি। কিন্তু ব্যাংকগুলো পুনঃঅর্থায়ান করছে না। এতে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে হলে তো শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে পারব না। তাই নতুনভাবে কারখানা পরিচালনার জন্য ঋণ দিতে হবে। কারণ শিল্প বাঁচলে ব্যাংকের মুনাফা হবে।




