ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
প্রায় প্রতিদিনই চলন্ত ট্রেনের ওপর নিক্ষেপ করা হচ্ছে পাথর। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থানেই আন্ত:নগর ও লোকাল ট্রেনের ওপর ঢিল ছোড়া হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটছে ৩০টির বেশি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, উশৃঙ্খল কিশোররা এ অপরাধমূলক কাজ করছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে সদ্য প্রকাশিত সতর্কতামূলক প্রচারপত্রে উল্লেখ রয়েছে-‘রেললাইনের পাশের স্থানীয় উশৃঙ্খল কিশোরগণ এ খারাপ কাজটি করে থাকে। তাদের নিক্ষিপ্ত পাথরে ট্রেনের জানালা-বাতি ভাঙ্গা ছাড়াও ট্রেন যাত্রীগণ আঘাতপ্রাপ্ত হন। ইতিপূর্বে এ ধরনের ঘটনায় একাধকি যাত্রী নিহত হয়েছেন।’
‘১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইন’ এর ১২৭নং ধারা অনুযায়ী চলন্ত ট্রেনে ঢিল বা পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় কেউ আহত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর মৃত্যু ঘটলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কাগজে এ আইন থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের নথিপত্রে পাওয়া সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটছে ৩০-৩৫টি। গড়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ট্রেনের প্রায় ২০টি দরজার গ্লাস পাথর নিক্ষেপের কারণে ভাঙছে। জনবল সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও গত ৫ বছরে এ রকম ঘটনা ঘটেছে দুই হাজারেরও বেশি। এসব গ্লাসের একেকটির দাম ১৫ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে পাথরের আঘাতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো যাত্রীর চোখ, মুখ ও মাথায় আঘাত লাগছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, কিছু জায়গায় নিয়মিত পাথর নিক্ষেপ করা হয়। ট্রেন যেহেতু হুট করে থামানো যায় না তাই নিক্ষেপকারীদের সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিতও করা যায় না।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে প্রীতি দাশ নামের এক তরুণী প্রকৌশলীর ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে পাথরের আঘাতে মৃত্যুবরণের ঘটনাটি দেশের মানুষকে স্পর্শ করেছে। এরপরই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সচেতনতা বাড়াতে জনসাধারণের মাঝে লিফলেট বিতরণ শুরু করে।
ঢিল ছোড়ার কোনো কারণ চিহ্নিত করা গেছে কি-না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ঢিল ছোড়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। কেউ কেউ কৌতুহলবশত নিক্ষেপ করে। আবার দেখা যায় খেলার ছলে শিশু-কিশোররাও ঢিল ছুড়ে মারে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো: আবু তাহের বলেন, রেলের যে জনবল তা দিয়ে সাধ্যমতো যাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাইরে থেকে ঢিল ছোড়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ট্রেনে ঢিল ছুড়ে মারার শাস্তি তুলে ধরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মাইকিং ও প্রচারপত্র বিলি করছে বলেও তিনি জানান।
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও খুলনা-পার্বতীপুর লাইনে প্রতিনিয়তই পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটছে। রেলওয়ের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলের ষোলশহর, ফৌজদারহাট, সীতাকুণ্ড, চৌমুহনী, কুমিল্লার শশীদল, ইমামবাড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, কসবা, পাঘাচং, ভাতশালা, শায়েস্তাগঞ্জ, বাল্লা, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, নরসিংদী, পুবাইল, গফরগাঁও, গৌরীপুর, মোহনগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, টঙ্গী, তেজগাঁও, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, লালমনিরহাট, পীরগঞ্জ, গাইবান্ধা, বুনারপাতা, সোনাতলা, আজিমনগর, খুলনা-পাবর্তীপুরের জামতৈল, কোটচাঁদপুর, নোয়াপাড়া, দৌলতপুর, রংপুরের আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, পীরগঞ্জ, কাউনিয়া, তিস্তা, বামনডাঙ্গা এলাকায় চলন্ত ট্রেনে সবচেয়ে বেশি ঢিল ছোড়া হয়।
চলন্ত ট্রেনে ঢিলের শিকার হয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেললাইনের পাশে কিছু শিশু-কিশোর-যুবককে তারা ঢিল মারতে দেখেছেন। কেউ গুলতি, কেউ পাথর আবার কেউ ইটের টুকরা নিক্ষেপ করে।
গত ৭ আগস্ট চট্টলা এক্সপ্রেসে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা জাকির হোসেন নিজেও চলন্ত ট্রেনে এ ধরনের হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়া স্টেশন পার হতেই দেখি, কয়েকজন কিশোর গুলতি দিয়ে ট্রেন লক্ষ্য করে আমাদের দিকে পাথর ছুড়ছে। তবে কেন তারা এমন করছে, তা বলা কঠিন।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশে প্রায় ২ হাজার ৯শ’ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এ দীর্ঘ পথে রেলের সীমিত জনবল দিয়ে বাইরে যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া রেলের জন্য কঠিন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাই যাত্রীদের হাত ও মাথা দরজা জানালার ভেতরে রেখে সচেতনতার সঙ্গে রেলগাড়ীতে ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছেন।




