বিশেষ প্রতিনিধিঃ (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
সংঘাত এড়িয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য আসন্ন সংসদ অধিবেশনই শেষ ভরসা। কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে এটিই শেষ অধিবেশন। আর এ অধিবেশনে এ বিষয়টি সুরাহা না হলে বিরোধী দল রাজপথকেই বেছে নেবে এমন ঘোষণাই দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী দিনগুলো নিঃসন্দেহে হবে সংঘাতময়। যার ভুক্তভোগি হবে সাধারণ জনগণ।
গত কয়েক মাস ধরে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ঢাকায় নিযুক্ত অন্য কূটনীতিকরা উভয় দলকেই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছে। সর্বশেষ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের ফোন ও তারপর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর চিঠি এবং আলাদা বৈঠকে ইইউ দুই প্রধান দলকে আলোচনায় বসার তাগিদ দেয়ার পরও এখনো আশাপ্রদ কিছু ঘটেনি। আর আলোচনার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কোনো আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না।
অপরদিকে, সঙ্কট নিরসনে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষ থেকেই আলোচনার জন্য এগিয়ে আসার দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। শেষ সংসদ অধিবেশনে নির্দলীয় সরকারের বিল উত্থাপনের অপেক্ষায় আছে তারা।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদের ১৯তম ও শেষ অধিবেশন বসবে।
বিরোধী দল অধিবেশনে যোগ দেবে কি না সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে বিল আনলে তারা সহযোগিতা ও সমর্থন দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে,ক্ষমতাসীনরা নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা নিয়ে বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার কথা বলছে। তারা বলছে, বিষয়টি নিয়ে সেখানেই আলোচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপির যুক্তি হচ্ছে, তারা কোনো প্রস্তাব দিলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বাতিল হয়ে যাবে। তাই তারা সংসদে কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করবে না। বরং সরকারকেই এ ব্যাপারে বিল আনতে হবে আর এ নিয়ে সংসদে তারা বিতর্ক করতে রাজি আছে। গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার এমন কথাই বললেন। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার জায়গা সংসদ নয়। এ ব্যাপারে উত্থাপিত প্রস্তাব নিয়ে সেখানে বিতর্ক হতে পারে।’
তবে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা খুব শিগগিরই জনসমক্ষে প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত সোমবার দলের সংসদীয় ককাসের এক সেমিনারে তিনি বলেন,‘শিগগিরই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।’ তবে এ বিল সংসদে পেশ করা হবে কি না এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি তিনি।
আর সংসদে যোগ দেবে কি না এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন,‘আমরা সংসদ যাবো কি যাবো না, এই বিষয়ে দু’একদিনের মধ্যে দল সিদ্ধান্ত নেবে।’
এদিকে আসন্ন শেষ অধিবেশনে নির্দলীয় সরকারের বিল উত্থাপন না করলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গত রোববার নরসিংদীতে ১৮ দলের জনসভায় তিনি বলেন, ‘সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করতে হবে। নির্দলীয় কিংবা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে আমাদের জোট যাবে না। একদলীয় নির্বাচনও হতে দেয়া হবে না।’
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিলে লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন,‘আপনারা হয় নির্দলীয় সরকারের দাবি মানবেন, না হয় পালাবার পথ খুঁজবেন। এখন আপনারাই চিন্তা করে দেখুন।’
খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি শেষ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এর পরের দিনগুলো যে সহিংস ও সংঘাতময় হবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিতই তিনি দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একাধিক নেতা জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদে কোনো প্রস্তাব দেয়ার সুযোগ নেই। যদি কোনো রূপরেখা সংসদে দেয়া হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল হয়ে যাবে। সঙ্কট সমাধানের সদিচ্ছা থাকলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসতে হবে। বিএনপি সেখানে সাহায্য করবে এবং সমর্থন দেবে।
চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে কোনো রূপরেখা সংসদে দেয়া হবে কি না জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন,‘এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
উল্লেখ্য, এর আগে ১৮তম অধিবেশন সামনে রেখে নির্দলীয় সরকার নিয়ে আলোচনার জন্য গত ২২ মে সংসদ সচিবালয়ে প্রস্তাব জমা দেন নোয়াখালী-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তবে অধিবেশন শুরুর আগেই এটাকে ‘ব্যক্তিগত প্রস্তাব’ উল্লেখ করে ২ জুন আলোচনার জন্য করা মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার টাইম লাইনটি সংক্ষেপে এরকম: গত সোমবার ও মঙ্গলবার পৃথক বৈঠকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপের তাগিদ দেয় ইইউ প্রতিনিধি দল। বুধবার তারা নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে এবং সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপের তাগিদ দিয়ে পৃথক চিঠি দেন।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ফোনালাপ করেন এবং চলমান পরিস্তিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এর আগেও গত মে মাসে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দুই নেত্রীই সংলাপে বসতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তারানকো চলে যাওয়ার পর ওই প্রক্রিয়া থমকে যায়।
প্রধান দুই দলের নীতিনির্ধারকদের সভা সমাবেশে আলোচনার জন্য তৈরি আছি এমন বক্তব্য থাকলেও দলীয় ফোরাম থেকে আলোচনার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ এগিয়ে আসেনি। যে কারণে সংঘাত এড়িয়ে সমস্যা সামাধানের শেষ ভরসা ১৯তম সংসদ অধিবেশন।
উল্লেখ্য, বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী, এই সংসদের মেয়াদ শেষ ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যে কারণে আসন্ন অধিবেশনটি শুধু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। বিরোধী দল নির্দলীয় সরকারের ব্যাপারে ফয়সালা চায় এ অধিবেশনে। সাধারণ মানুষও তাকিয়ে আছে সংসদের দিকেই।




