ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে দেশ ও জনগণের সঙ্গে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে নয়। দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পথে বরং এটা অন্তরায়। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে বিএনপির বাস্তবভিত্তিক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য-নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা সে রকম থাকা উচিত, যেটা বাংলাদেশের জনগণ চান। সম্প্রতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফর করে। এ সফর নিয়ে সোমবার আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। প্রতিনিধি দলের অন্য দু’জন হলেন- ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির। ৪ দিনের সফর শেষে রোববার রাতে বাংলাদেশে ফেরেন আমীর খসরু ও আবদুল আউয়াল মিন্টু। আর হুমায়ুন কবির ভারত থেকে লন্ডন চলে যান।
সূত্র জানায়, এ সফরে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রামলাল, বিজেপি নেতা বিজয়জলী, রাজীব গান্ধী ফাউন্ডেশন এবং অর্গানাইজেশন অব রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ), বিবেকানন্দ ফাউন্ডেশন, শ্যামা প্রসাদ ফাউন্ডেশন ও ইন্সটিটিউট অব ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিসের (ইডসা) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। এছাড়া দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির উচ্চপদস্থ ও গুরুত্বপূর্ণ দুই কর্মকর্তার সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা।
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভারতের সহায়তা চেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, সহায়তার কোনো বিষয় নয়। শুধু ভারত নয়। আমাদের আলোচনা হয়েছে সবার সঙ্গে। একই আলোচনা হয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ সবার সঙ্গেই। এখানে ভিন্ন কিছু নেই।
আমীর খসরু বলেন, সফরে আমরা ভারতীয় থিংক ট্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এটি কোনো অফিসিয়াল সফর ছিল না। থিংক ট্যাংকের আলোচনায় আমরা আমন্ত্রিত ছিলাম। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আলোচনায় কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে ছিল। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে, এসব আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ছিল। নির্বাচন সামনে রেখে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। নির্বাচনী গতি কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। আর ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’র (সবার জন্য সমান সুযোগ) তো প্রশ্নই আসে না।
বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার, নির্বাচিত সরকার ও নির্বাচন যে প্রশ্নবিদ্ধ, তা কারও অজানা নেই। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা সবার প্রত্যাশা। এসব বিষয়ে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকার ভারতের মদদে হয়েছে কিংবা টিকে আছে- এ রকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশে রয়েছে। সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তাই আগামী জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক সবার ভূমিকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমীর খসরু বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের থিংক ট্যাংক অবগত আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং তার মামলার বিষয়টিও থিংক ট্যাংক জানে।
বাংলাদেশের কারও কারও ভারতবিরোধী মনোভাব আছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, ক্ষমতাসীন দল তো এটাকে মূলধন করছে। তারা মূলধন করার কারণে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আরও গভীর হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে ভারতের যে ভূমিকা থাকবে, তা বাংলাদেশের জনগণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সব দেশই বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়, আইনের শাসন ও বাক স্বাধীনতা দেখতে চায়।
নির্বাচনকে নিয়ে থিংক ট্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ইতিবাচক কোনো ফল প্রত্যাশা করছেন কিনা এমন প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, আমাদের সঙ্গে যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা উনারাও অনুভব করছেন। এটা তো একটা ‘পজেটিভ’ দিক। বাংলাদেশে বর্তমানে একটা অরাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালানো হচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আলোচনা দরকার- তারা তা অনুধাবন করছে। আলোচনা-পর্যালোচনা করার পর একটা সমাধানের দিকে যাওয়া, এটাই তো একটা পজেটিভ দিক।
ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো, সেটা পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে খসরু বলেন, এখানে কোনো দলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক আছে, তা আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি, সম্পর্ক রয়েছে দু’দেশের জনগণের মধ্যে। এখানেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের ব্যাপক পার্থক্য। আওয়ামী লীগ দলের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে।
এটাকে মূলধন করে যে রাজনীতি করছে, সেটা ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের জন্য ভালো নয়। বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে দু’দেশের মানুষের সঙ্গে। দু’দেশের সঙ্গে। সুতরাং এখানে একটা ব্যবধান রয়েছে। ভারতের যারা নীতিনির্ধারক, তারা নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করছে দুই দেশের সম্পর্কটা জনগণের মধ্যে, দেশের মধ্যে। এটা না থাকলে সত্যিকার অর্থে বন্ধুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা খুবই কঠিন।
আমীর খসরু আরও বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এজন্য আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। ভারতের নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। ভারতে তো আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না। সবকিছু বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুতরাং দুটি দেশের সম্পর্কের মধ্যে কতগুলো সাধারণ মূল্যবোধ আছে, সেগুলোর যদি সমতা না থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ক বেশিদিন টিকতে পারে না। অর্থাৎ জনগণের আস্থাহীন কোনো সম্পর্ক তো টিকে থাকতে পারে না। এ বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতারা বা দলের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে থিংক ট্যাংক কী ভূমিকা পালন করতে পারে- এমন প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, থিংক ট্যাংক তো একটা অংশ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের একটি ভূমিকা থাকে।
তারা সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা মতামত প্রকাশ করে। থিংক ট্যাংকের কাজ হল গবেষণা করে তাদের মতামত তুলে ধরা। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ। আরও আলাপ-আলোচনা হবে। সব পর্যায়ে আলোচনা হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত সম্পর্কে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘না’। তিনি আরও জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই তাদের এ ভারত সফর।




