ষ্টাফরিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
ইয়াবার মরণনেশায় ছেয়ে যাচ্ছে দেশ। আর, এগুলো ঢুকছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে। পাচার হয়ে আসছে দিনে কমপক্ষে দুই লাখ বড়ি। বিনিময়ে মিয়ানমার চলে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু শতচেষ্টা করেও এর লাগাম টেনে ধরতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সীমান্ত-বাণিজ্য ব্যবহার করে মাদক চোরাচালানিরা কার্গো, গবাদিপশুর ট্রলার, ট্রানজিট ট্রলার, নাফ নদী ও সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া নৌকার মাধ্যমে এই বড়ি দেশে আনছে। পরে তা বিধবা, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, রিকশাচালক, ভিক্ষুক ও রোহিঙ্গা নারীদের দিয়ে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার অনেক স্থানে দোকান খুলে বসে আছেন হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন নামে এসব দোকান চলছে। তালিকায় রয়েছে ফার্মেসি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, পান, চাল, মুদি, জাল, জুতা ও কাপড়ের দোকান। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই হুন্ডি ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা-বাণিজ্য চললেও এর প্রতিরোধে নেই তেমন কোনো উদ্যোগ।
ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাধিক সূত্র জানায়, টেকনাফ সীমান্তের কমপক্ষে ৪১টি স্থান দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন ইয়াবা বড়ি এ দেশে আসছে। মূল্য বাবদ প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা চলে যাচ্ছে মিয়ানমারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের হাতে। টেকনাফ স্থলবন্দরের পণ্যবাহী যানবাহন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস-মিনিবাস, প্রাইভেট কার ও সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলার ইয়াবা আনার মূল মাধ্যম। পাচারকারীরা কৌশল হিসেবে অবলম্বন করে অভিনব সব পন্থা। তরকারির ব্যাগ, স্কুলব্যাগ, টিফিন ক্যারিয়ার, মাথার খোঁপা, ল্যাপটপ, মুঠোফোন, সিগারেট-আচার-পটেটো প্যাকেট, গর্ভবতী নারীর বেশ, জুতা ও শিশুদের খেলনাভর্তি ব্যাগ এই পন্থাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ইয়াবার বড় চালান মিয়ানমার থেকে টেকনাফ সীমান্তপথ ছাড়াও ট্রলারযোগে সমুদ্রপথে কক্সবাজার, মহেশখালী, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের গত কয় মাসে টেকনাফ থানার পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্টগার্ড বাহিনী পৃথক অভিযান চালিয়ে দুই লাখ ৪০ হাজার ৬০৪টি ইয়াবা বড়িসহ ১৪৪ জনকে আটক করেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১২৭টি। উদ্ধারকৃত এসব ইয়াবার বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ বিষয়ে গত ৮ এপ্রিল কক্সবাজারে টাস্কফোর্সের সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মোহাম্মদ আলী বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতার কারণে সীমান্ত দিয়ে অবাধে মাদকদ্রব্য আসছে। সভায় লে. কর্নেল মো. জাহিদ হাসান স্থলবন্দরের হিমায়িত মাছ এবং কাঠের ভেতর দিয়ে ইয়াবার চালান আসছে বলে উল্লেখ করেন।
জেলা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সদর সার্কেলের পরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ইয়াবার প্রধান রুট টেকনাফ। এখান থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ এই বড়ি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অথচ এই টেকনাফে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো শাখা নেই।
৪২ বিজিবি টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জাহিদ হোসেন ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মিয়ানমারের মংডুটাউনশিফের চারটি কারখানায় ইয়াবা বড়ি তৈরি হয়। কিন্তু মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার অসহযোগিতার কারণে এর চালান বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া স্থলবন্দরে চোরাচালান হয়ে আসা মাদকদ্রব্য শনাক্ত করার কোনো যন্ত্র নেই।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আজাদ মিয়া ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইয়াবা নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি সংস্থা কাজ করছে। কোস্টগার্ড, বিজিবি, পুলিশ। বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে একাধিক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটক করা হয়েছে। আজকেও টেকনাফ থেকে ১৬ হাজার ইয়াবা ধরা হয়েছে। এর লাগাম টেনে ধরতে চেষ্টা চালাচ্ছি। যাতে ইয়াবার অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পায়।
সর্বশেষ শনিবার কক্সবাজারে ২৭ হাজার ৫৫০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে আটক করেছে র্যাব। র্যাব-৭ এর সদস্যরা শুক্রবার রাত ২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উখিয়া এলাকায় এ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব-৭ এর কক্সবাজার ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর সরওয়ার-ই আলম ঢাকা টাইমসজানিয়েছেন, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। আটকদের পুলিশে দেয়া হয়েছে। তার ধারণা এসব মিয়ানমার থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।
এরআগে চট্টগ্রাম নগরীর আছদগঞ্জ থেকে আটক ১০ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা ট্যাবলেটের বিশাল চালানটিও এসেছে মিয়ানমার থেকে। এ চালানটির মূল হোতা রশিদ আহমেদ। তার নিজেরই আছে ১৫টি গ্রুপ। ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত এ ধরনের অন্তত ৪০টি গ্রুপ রয়েছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চোরাচালানের নেপথ্যে কোন না কোন রাঘববোয়াল জড়িত।




