রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী অটল থাকলে জনগণকে নিয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে ‘তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’। সোমবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনস্থ মুক্তিভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। তবে এ ইস্যুতে বিএনপি’র সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করবে না তারা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ইস্যুতে ২৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকা সংবাদ সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা এ সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।
এতে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ শহিদুল্লাহ ও সংগঠনের সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। এ সময় বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এও ঘোষণা দেয়া হয়, রামপাল ইস্যুতে বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিলেও তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটি বিএনপি’র সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কোনো আন্দোলনে যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন-জানার পর কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে, হয়তো তিনি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং দেশজুড়ে জনমত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করবেন। কিন্তু ঘটলো উল্টো। এতোদিন ধরে কোম্পানির কনসালট্যান্ট, স্তাবকবৃন্দ যেসব ভুল ও অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেগুলোই পুন:ব্যক্ত করেছেন। ২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন তথ্য ও যুক্তি খণ্ডন করে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিজ্ঞাপনী ছবি দেখে দূষণ হচ্ছে কি না তা বোঝা যায় না। সব গাছপালা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
প্রধানমন্ত্রী বেগুন ক্ষেতে ছাই ছিটিয়ে জমি উর্বর করার উদারণ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি সম্ভবত: কাঠ পুড়িয়ে তৈরি জৈব ছাই এবং খনিজ কয়লা পুড়িয়ে তৈরি ছাইয়ের পার্থক্য সম্পর্কে অবগত নন। কয়লা পুড়িয়ে তৈরি ছাই বিষাক্ত বলে এ ছাইয়ের মাধ্যমে জমি উর্বর করার চিন্তা বিপজ্জনক।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, দূষিত গরম পানি পশুর নদীতে ফেলা হবে না। অথচ পশুর নদীতে যে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি বেশি গরম পানি ফেলা হবে সেটি খোদ কোম্পানিরই স্বীকার করা তথ্য। জাইকার একটি রিপোর্টে থার্মাল ইফ্লুয়েন্ট নির্গমনের ফলে পানির তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বাড়বে। এতে মাছের ক্ষতি হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৭২টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে ১৮৮টি থেকে নদীতে পানি নির্গমনের বেলায় আর্সেনিক, বোরন, কেডমিয়াম, সীসা, পারদ এবং সেলিনিয়ামের কোনো সীমা বা মাত্রা মেনে চলা হয় না।
নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টেও দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা, কেনটাকি, অর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইওসহ ১০টি রাজ্যের ২১টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নদী ও জলাভূমি ফেডারেল ড্রিংকিং স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি আর্সেনিক সম্পন্ন পানি নির্গত হচ্ছে। ঢাকার নদীগুলোতে প্রতিদিন ৯০ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধণ ছাড়াই ডিসচার্জ করা হয়। ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা হয় না।
‘বায়ুপ্রবাহ সুন্দরবনের বিপরীত দিকে, সুন্দরবনের উল্টো দিকে প্রবাহিত হবে’ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের জবাবে বলা হয়, সরকারি নির্দেশ দিয়ে বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বছরে অন্তত: চার মাস বাতাস বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা থেকে সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হয়।
রামপাল ইস্যুতে বিএনপিও আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে কি না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আনু মুহাম্মদ বলেন, আমরা এতদিন ধরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প সম্পর্কে যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আসছি বিএনপি এতোদিনে সেটি উপলব্ধি করতে পেরেছে। এ কারণেই হয়তো তারাও আন্দোলনে যাচ্ছে। তবে এ ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রশ্নই ওঠে না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সরকার যদি রামপাল ইস্যুতে তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় সংগঠন সেটি বিবেচনা করবে। তিনি জানান, সরকার নিজেই বিএনপিকে রামপাল ইস্যু ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতের বিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তি বাতিল করলে বিএনপি হয়তো সে সুযোগ পেতো না।




