শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনচট্রগ্রামে গ্যাস সংকট আর কত দিন?

চট্রগ্রামে গ্যাস সংকট আর কত দিন?

দুই বছরে চট্টগ্রামে গ্যাসের চুলা বেড়েছে প্রায় দুই লাখ। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। বেড়েছে গ্যাস নির্ভর বিভিন্ন স্থাপনা। গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন বাড়লেও যোগানের কোন সংস্থান নেই। চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হতো। কিন্তু গতকাল চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান দেয়া হয়েছে ১৮১ মিলিয়ন ঘনফুট। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সংকট চললেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি এত নাজুক হওয়ার রেকর্ড নেই বলেও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এতে নগরীতে জনদুর্ভোগ আরও প্রকট হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো নগরীর বেশিরভাগ এলাকার বাসাবাড়িতে অধিকাংশ সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। অন্তত চার লাখ চুলায় রান্নার আগুন জ্বলেনি। কোনো কোনো এলাকায় বিকালে ও কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে প্রায় সবক্ষেত্রেই গ্যাসের চাপ ছিল কম। কিছু কিছু বাসা বাড়িতে কেরোসিনের চুলা, ইলেক্ট্রিক চুলা, ওভেন প্রভৃতিতে রান্নাবান্না চলছে। তবে অধিকাংশ বাড়িতেই বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সংকটে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় চাপ পড়ে হোটেলরেস্তোরাঁয়। তবে গ্যাস সঙ্কটের কারণে হোটেলে গিয়েও খাবার পাননি অনেকে। গতকাল দুপুরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে হোটেলে ছিল দীর্ঘ লাইন। অনেকেই শুধু শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। সিএনজি স্টেশনে দিনে ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বাকি সময় গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের সামনেও দেখা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। নগরীতে যান চলাচল কমে গেছে। বেড়ে গেছে সিএনজি টেক্সির ভাড়াও।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তারা বলেছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে গ্যাসের কোন উৎস নেই বললেই চলে। চিমুতাং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে কিছু গ্যাস চট্টগ্রামে আসলেও বাকি চাহিদা পূরণ করা হয় সিলেট, কুমিল্লা এবং ফেনী অঞ্চলের গ্যাস দিয়ে। নব্বইর দশকের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময় আর্শীবাদ হিসেবে আবিকৃত হয় দেশের একমাত্র সাগরকেন্দ্রিক গ্যাস ক্ষেত্র সাংগু। কিন্তু সাংগুর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চট্টগ্রামে আবারো গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করে।

ইতোমধ্যে ২০১৩ ইং সালের ৮ মে থেকে চট্টগ্রামে নতুন করে প্রায় দুই লাখ চুলায় গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে ৫ লাখের মতো আবাসিক চুলা জ্বালাতে দৈনিক ৪০/৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্যান্ট রয়েছে ১৬৩ টি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ৬২টি, বাণিজ্যিক গ্রাহক ২ হাজার ৫৩০ ও শিল্প গ্রাহক রয়েছে ৯১৯টি। শিল্প বাণিজ্যিক এবং সিএনজি স্টেশন মিলে আরো প্রায় একশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রায়াত্ত সার কারখানা সিইউএফএল এবং বহুজাতিক সার কারখানা কাফকোতে সার উৎপাদনে ৯৬ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সবকিছু মিলে চট্টগ্রামে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলে কোন সংকট থাকে না। কিন্তু চট্টগ্রামে সর্বসাকুল্যে গ্যাস দেয়া হয় ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার অর্ধেক গ্যাস দিয়ে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টর টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠে।

ভয়াবহ এই অবস্থার মাঝে সিলেটের বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদনে ধস নামে। কনডেনসেটের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই গ্যাস ফিল্ডে দৈনিক চারশ’ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের উপজাত হিসেবে কনডেনসেট পাওয়া যায়। এসব উপজাত বিপিসি কিনে নিত। গত কয়েকদিন ধরে তারা তা নিচ্ছে না। এতে পাইপ লাইনে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং সরবরাহও কমে গেছে। এ কারণে ন্যাশনাল গ্রিডে যোগান কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামেও সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ২৭০/২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে চট্টগ্রামে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে ১৮১ মিলিয়ন ঘনফুট। লাইনে প্রেসার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় আশুগঞ্জ বাখরাবাদ সঞ্চালন লাইনে এর থেকে বেশি গ্যাস আসছে না। এই অবস্থায় বহুজাতিক সার কারখানা কাফকো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সিইউএফএল বন্ধ রয়েছে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে। কাফকো বন্ধ করেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। নগরীর শিল্পকারখানাগুলো রেশনিং সময়ের পরেও গ্যাস পাচ্ছে না। সিএনজি স্টেশনগুলো বিকেল তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সরকারি আদেশে বন্ধ থাকে। এরপর থেকে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস থাকার কথা থাকলেও চট্টগ্রামের একটি স্টেশনেও পর্যাপ্ত গ্যাস নেই।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণ কবে ঘটবে সে সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। এ ব্যাপারে গতকাল কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পদস্থ একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের কোন লক্ষণ নেই। কোন সুখবরও নেই। আমরা পরিস্থিতির কথা পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছি। এখন সরকারই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ