রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়ভুল নম্বরে ডায়াল করতে গিয়ে আরিফ- মিথির

ভুল নম্বরে ডায়াল করতে গিয়ে আরিফ- মিথির

পরিচয় হয়েছিল মোবাইলে। ভুল নম্বরে ডায়াল করতে গিয়ে। তারপর দিনের পর দিন মোবাইলে দু’জনের কথোপকথন। পাবনার পাশাপাশি দু’টি উপজেলায় তাদের গ্রামের বাড়ি। মেডিকেল ছাত্রী মিথিকে ভুল পরিচয় দিয়েছিল আরিফ। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা আর বেকারত্ব দুই-ই কৌশলে আড়াল করে রেখেছিল। এমনকি মাদকাসক্তির কথাও। আরিফের এই কৌশল বুঝতে পারেনি মিথি। তাই সহজেই আরিফের প্রেমের ফাঁদে পা বাড়ায় সে। জড়িয়ে পড়ে গভীর সম্পর্কে। এক পর্যায়ে লিভটুগেদার শুরু করে দু’জন। কিন্তু যখন একে একে আরিফের সব কিছু মিথির সামনে পরিষ্কার হতে থাকে। তখনই শুরু হয় গণ্ডগোল। এ নিয়ে উচ্চবাচ্যের একপর্যায়ে প্রেমিকা মিথিকে নিজ হাতে শ্বাসরোধে হত্যা করে আরিফ। গতকাল আরিফকে আদালতে সোপর্দ করলে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। নিজের অপকর্মের কথা অকপটে স্বীকার করে। এদিকে বুধবার রাতেই মিথিকে পাবনার সাঁথিয়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়েছে। ডাক্তারি পড়ুয়া মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন মিথির বাবা-মা ও ভাইবোন-স্বজনেরা। তারা খুনি আরিফের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
গত বুধবার সকালে হাজারীবাগ সুলতানগঞ্জের ৩/৫ নম্বর সচিবের গলির বাসার ষষ্ঠতলার একটি কক্ষ থেকে সাউদিয়া আক্তার মিথির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মিথি জেডএইচ শিকদার উইমেন মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। আরিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে তারা ওই কক্ষটি সাবলেট হিসেবে ভাড়া নিয়ে লিভটুগেদার করে আসছিলেন। হাজারীবাগ থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আরিফ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। কিভাবে সে মিথিকে হত্যা করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। আদালত আরিফকে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, সাক্ষী হিসেবে মিথি যে বাসায় থাকতো সেই বাসার বাসিন্দা নুসরাত সাথী, মিথির বান্ধবী রোমানা নাজনীন ও তার কথিত প্রেমিক অনিও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশ খুব শিগগির এই মামলার চার্জশিট দেবে বলেও তিনি জানান।
মিথির সহপাঠী, পুলিশ ও স্বজন সূত্রে জানা গেছে, ভুল নম্বরে কল গিয়ে মোবাইলে মিথির সঙ্গে পরিচয় হয় আরিফের। বেকার আরিফ এ সময় নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে বলে মিথির কাছে পরিচয় দেয়। কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তোলে মিথির সঙ্গে। মিথিও আরিফের কথার জালে আটকা পড়ে প্রেমের ফাঁদে পা বাড়ায়। মোবাইলেই দু’জনে তুমুল প্রেম করতে থাকে। একপর্যায়ে দেখা করে তারা। তখনও ঘুণাক্ষরেও মিথি বুঝতে পারেনি আরিফ একজন প্রতারক, বেকার ও মাদকাসক্ত। একপর্যায়ে তারা দু’জনে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে হোস্টেলে থাকার কথা জানলেও মিথি আরিফের সঙ্গে বাসা ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে থাকা শুরু করে। এরপরই সে বুঝতে পারে নিজের ভুলের কথা। ভুল বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করতে থাকে মিথি। চাকরি না করে বাসা থেকে আনা তার টাকার ওপর নির্ভর করাটা মেনে নিতে পারছিল না সে। এমনকি মিথি জানতে পারে আরিফ নিয়মিত ফেন্সিডিল খায়। তাদের পারিবারিক অবস্থাও ভাল না। আরিফ এসএসসি পাস সাধারণ ছেলে তা-ও জেনে যায় মিথি। এসব জানতে পেরে অনেকটা ভেঙে পড়েছিল সে। লিভটুগেদার করলেও সংসার করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু এ বিষয়ে কোন গুরুত্ব ছিল না আরিফের। মাদকাসক্ত আরিফ মিথির আনা টাকা দিয়ে দিব্বি আড্ডাবাজি করতো। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মজা করতো। এগুলো সহ্য করতে পারতো না মিথি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় টানাপড়েন। নিজের ভুল বুঝতে পারে মিথি। কিন্তু মনের মানুষকে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আর ফেরার পথ খুঁজে পায়নি সে। তার আগেই ঘাতক আরিফ তাকে শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিকদার মেডিকেলের ছাত্রী হোস্টেলের ২১২ নম্বর কক্ষটি মিথির জন্য বরাদ্দ ছিল। আগে মিথি নিয়মিত হোস্টেলে থাকলেও সম্প্রতি মাঝে-মধ্যে হোস্টেলে যেতো। যেই বাসায় তারা সাবলেট হিসেবে থাকতে সেই নুসরাত সাথীসহ একসঙ্গে তারা ওই বাসায় উঠেছিল। সাথীকে ভাবী বানিয়ে তারা একসঙ্গে ওই বাসায় ওঠে। এর আগে তারা সচিবের গলির আরেকটি বাসায় ভাড়া থাকতো। ওই বাসার প্রতিবেশী বাসিন্দারা জানান, সবাই তাদেরকে একই পরিবারের সদস্য বলে জানতো। কিন্তু মিথির মৃত্যুর পর প্রকৃত ঘটনাটা জানতে পারে সবাই। মিথির পিতা আবদুস সালাম বলেন, আরিফ কৌশলে তার মেয়েকে ফাঁদে ফেলে সম্পর্ক করেছে। আরিফ আসলে মিথির যোগ্য পাত্রই নয়। আরিফের মতো তার বাবাও বেকার। কোনরকমে টেনেটুনে সংসার চালায় তারা। এ কারণে আরিফ বেশি দূর লেখাপড়া পর্যন্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে আর ক’দিন পরই মিথি ডাক্তার হতো। সামনে তার সোনালী ভবিষ্যৎ হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। মিথি তার ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চেয়েছিল বলেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি খুনি আরিফের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখতে চেয়েছিল আরিফ: মিথিকে হত্যার পর তার লাশের গলায় ওড়না বেঁধে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতে চেয়েছিল আরিফ। গতকাল আদালতে আরিফের দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। আরিফ তার জবানবন্দিতে বলে, রাতে মিথির বান্ধবী রোমানা ও তার কথিত স্বামী অনিসহ দীর্ঘ সময় আড্ডা দেয়। এক পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিথির সঙ্গে তার ঝগড়া শুরু হয়। এ সময় তারা নিজেদের কক্ষে চলে যায়। ঝগড়ার বিষয়টি যেন বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে এজন্য সে উচ্চ সাউন্ডে গান বাজাতে থাকে। এ সময় তারা দু’জন একে-অপরের ওপর হামলা করে। একপর্যায়ে আরিফ মিথির গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে বালিশ চাপা দিয়ে রাখে কিছু সময়। মিথির মৃত্যু হলে সে গলায় ওড়না বেঁধে সিলিং ফ্যানে ঝোলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মিথির ওজন বেশি হওয়ায় একা ঝোলাতে ব্যর্থ হয়। পরে মেঝেতে মিথিকে শুইয়ে রেখে সাথীকে বিষয়টি জানায়। পাশের কক্ষ থেকে উঠে আসে রোমানা ও অনি। আরিফের বিভ্রান্তিকর কথায় তারা বুঝতে পারে। কিন্তু নিজেরাও ফেঁসে যাবে বলে বিষয়টি গোপনের চেষ্টা করে। ভোরে বিষয়টি মিথির মাকে জানায়। পরে খবর পেয়ে সকালে পুলিশ গিয়ে মিথির লাশ উদ্ধার করে ও আরিফসহ অপর তিনজনকে আটক করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার এসআই হালিম জানান, আরিফ সবকিছু স্বীকার করেছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। এছাড়া অপর তিনজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে। সাক্ষ্যের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। -মানবজমিন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ