শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়শরিয়াহ ভিত্তিক ৬ ব্যাংকে নিয়োগে অনিয়ম খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

শরিয়াহ ভিত্তিক ৬ ব্যাংকে নিয়োগে অনিয়ম খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দেশের ছয়টি ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিয়োগ ও ছাঁটাই কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক খাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং হঠাৎ করে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ উঠায় বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলাকে কেন্দ্র করে নিয়োগ ও ছাঁটাই কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট এলাকা থেকে অস্বাভাবিক হারে নিয়োগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে নানা অজুহাতে কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নিজস্বভাবে তদন্ত চালিয়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করলেও পুরো নিয়োগ ও ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি যথাযথ আইনি কাঠামো মেনে হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে এই তদন্তে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ পরিদর্শক দল ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে, যারা মূলত নিয়োগের আগে জাতীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার উপস্থিতি এবং প্রার্থীদের সনদের সত্যতা যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তদন্তের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো— ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটি ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে তা আদালতেও উপস্থাপন করা হতে পারে। মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করাই এই কমিটির প্রধান কাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে ২০১৬ সালের শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট জনবল ছিল ১৩ হাজার ৫৬৯ জন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে আরও প্রায় ১১ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৩৪০ জনকে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিশাল জনবল নিয়োগের বৈধতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর মাধ্যমে একটি বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করা হলেও ৫ হাজার ৩৮৫ জন অভিযুক্ত কর্মীর মধ্যে মাত্র ৪১৪ জন তাতে অংশগ্রহণ করেন। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি বা ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের প্রথমে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয় এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত ১৯ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা, যাদের দাবি শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেই প্রায় ১০ হাজার কর্মীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই দিনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’ নামে আরেকটি পক্ষ ছাঁটাইয়ের সমর্থনে পাল্টা কর্মসূচি পালন করে।

বর্তমানে এই নিয়োগ ও ছাঁটাই সংক্রান্ত বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিয়োগ প্রদান বা চাকরি বহাল ও বাতিলের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ওই ব্যাংকের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ ও নীতিমালার এখতিয়ারভুক্ত।

চাকরিচ্যুত কর্মীরা দফায় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন। তারা গভর্নর বরাবর স্মারকলিপিও পেশ করেন, যেখানে চাকরি পুনর্বহাল, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং ছাঁটাই প্রক্রিয়ার তদন্তের দাবি জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, যথাযথ কারণ ছাড়াই অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, যা শ্রম আইনের পরিপন্থী।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গঠিত কমিটি সংশ্লিষ্ট ছয়টি ইসলামী ব্যাংকের গত কয়েক বছরের নিয়োগ নীতিমালা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং ছাঁটাইয়ের কারণ ও বৈধতা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই করা হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ