শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২৬
প্রচ্ছদআরো খবর......র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকসের ২০ হাজার কোটি পাচার কেলেঙ্কারি তদন্তে দুদক

র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকসের ২০ হাজার কোটি পাচার কেলেঙ্কারি তদন্তে দুদক

‘র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকস্ লিঃ’ ও মালিকদের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আন্ডার-ইনভয়েসের মাধ্যমে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানে দুই সদস্যের টিম গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থার উপ-পরিচালক মোঃ আলমগীর হোসেন টিমের প্রধান। টিমের অপর সদস্য সহকারী পরিচালক মোঃ আল-আমীন। বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে ইলেকট্রনিক সামগ্রী সরবরাহ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিগত সরকারের দেড় দশকে অন্ততঃ ২০ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার সংক্রান্ত সংবাদপত্র প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গত ১৭ জুলাই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।

এর আগে হাসিনা অনুগত দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে দায়মুক্তি দিয়েছিলো। এ বিষয়ে গত ১ জুলাই প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক । ওই প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে গত ১৭ জুলাই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। সিদ্ধান্তের আলোকে অনুসন্ধানের লক্ষ্যে গঠন করা হলো দুই সদস্যের টিম।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী মাফিয়া শাসনামলে অন্ততঃ ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে ‘র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লি:’। আত্মসাৎ করেছে সরকারের অন্ততঃ ৪ হাজার কোটি টাকা। বিগত সরকারের বিভিন্ন আইসিটি প্রকল্পে ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে লুটেছে শত শত কোটি টাকা। এসব করে প্রতিষ্ঠানটির মালিকগণ দেশ-বিদেশে, নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন পর্বতসম সম্পদ। জাল-জালিয়াতি,ভ্যাট,ট্যাক্সের অর্থ আত্মসাৎসহ বহুমাত্রিক আর্থিক অপরাধ করেও ‘র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স’ রয়ে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)র দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠান মালিকগণ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন নির্বিঘেœ। অপরাধ লব্ধ এ অর্থের কিছু অংশ ডোনেট করেছেন আওয়ামীলীগের দলীয় তহবিলে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট এবং দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সেসব না দেখার ভাণ করেছে। কখনো বিপুল অর্থের নজরানার বিনিময়ে দিয়েছে দায়মুক্তি। কখনো প্রভাবশালী আওয়ামী ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রভাবে দিয়েছে ধামাচাপা। তবে প্রতিবেদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে প্রতিষ্ঠান মালিকদের অন্ধকার সাম্রাজ্য।

অনুসন্ধান মতে, র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড হালে এটি ‘সনি র‌্যাংগস’ নামে সমধিক পরিচিত। ৪১ বছর আগে ১৯৮৪ সালে মরহুম আখতার হুসেন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করায় তার স্ত্রী-সন্তানরা এখন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। ‘র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিঃ’র বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকতার হুসাইনের পুত্র জিমি একরাম হুসাইন ওরফে জে.একরাম। ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে রয়েছেন আখতার হুসেনের মেয়ে বিনাস হুসাইন। ভাইস চেয়ারপার্সন হিসেবে রয়েছেন আকতার হুসাইনের স্ত্রী সাচিমি হুসাইন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যবসার নামে দুর্বৃত্তায়িত প্রতিষ্ঠানটির বড় হাতিয়ার হচ্ছে এর মালিকদের জাপানি নাগরিকত্ব। যখনই বাংলাদেশের কোনো আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের অপরাধ তদন্তে নামে-তখনই তারা সামনে আনেন ‘জাপানি নাগরিকত্ব’। এই বলে তারা ভয় দেখান যে, এ ব্যবসায় জাপানি বিনিয়োগ রয়েছে। মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করলে জাপানিরা তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে। এ ছাড়া তাদের প্রতিষ্ঠানে রয়েছে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান। ফলে তদন্তকারী সংস্থাগুলো বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে হাস্যকর যুক্তির ভিত্তিতে দায়মুক্তির পথ বাৎলে দেয়।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠানটির মালিক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের রয়েছে বিপুল সম্পদ। এর মধ্যে বাড়ি নং-৮, রোড-১১৮, গুলশান-১। এটি একটি বিলাসবহুল ফরলেক্স বাড়ি। যার আনুমানিক মূল্য ৩শ’ কোটি টাকা। (২) বাড়ি নং-এ-২ বসতি ময়ূরী, ৮/১, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা। ৯ তলা এই ভবনটির আনুমানিক মূল্য অন্তত দেড় শ’ কোটি টাকা। (৩) জে.একরাম হুসাইনের জেনারেল ম্যানেজার জানে আলম। তিনি বসতি-ময়ূরী, ৮/১, সেগুবাগিচায় বসবাস করেন। তার নামে এই অ্যাপার্টমেন্টে ৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। গাজীপুর, কালিয়াকৈরে খতিয়ান নং-২৪, মৌজা-মোথাজুরি, জে.এল.নং-১। এখানে ৩শ’ একর জমি। বনবিভাগের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করে র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকসকের মালিকগণ রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বাংলা মোটর শাখা ম্যানেজার, জনতা ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুস সালাম আজাদকে ১০ শতাংশ হারে কমিশন দিয়ে এ অর্থ পাচার করা হয়।

এনবিআর’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিবছর ঘুষ দিয়ে এটি রফা-দফা করছে। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার এনায়েত মল্লিক এনবিআর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে এসব ‘ম্যানেজ’ করছেন।

সিঙ্গাপুরের ঠিকানা : (এক) করঃপযবহবৎ খরহশ, ঈরঃু ঝয়ঁধৎব জবংরফবহপবং, টহরঃব-২৪-০৫, ঝরহমধঢ়ড়ৎব-২০৭২২৭ (দুই) ঞৎঁংঃ সড়ঃঃড় ঢ়াঃ. খঃফ, ১৪০, চধুধ খবনধৎ জড়ধফ # ১০-২২, অত@চঅণঅ খধনবৎ ঝরহমধঢ়ড়ৎব, ৪০৯০১৫ ঝরহমধঢ়ড়ৎব. ব্যবহৃত এসব সম্পত্তির মালিক মরহুম আকতার হুসেন। উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তমান সাচিমি হুসাইন, জে. একরাম হুসাইন ও বিনাস হুসাইন। আকতার হুসেইন ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী, পুত্র এবং তাদের স্ত্রী বিদেশী নাগরিক হওয়ায় এদেশে থাকা সম্পত্তিগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিক্রয়লব্ধ টাকা কখনো হুন্ডি, কখনো আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে সরিয়ে নিচ্ছেন বিদেশে। আওয়ামী আনুগত্য ও দলীয় শেল্টারে ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে বছরে গড়ে সাড়ে ৭ শ’ কোটি টাকা হিসেবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো পাচার করে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে.একরাম হুসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে এসএমএস পাঠানো হয় , এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ