বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৪
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনএলবিয়ন গ্রুপের মালিকদের বিপুল সম্পদের তথ্য গোপন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ দুদকে

এলবিয়ন গ্রুপের মালিকদের বিপুল সম্পদের তথ্য গোপন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ দুদকে

চট্টগ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ও এর সহযোগী ছয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামগ্রী ভিন্ন ভিন্ন প্রেসে ছাপিয়ে প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণের টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের নামে-বেনামে রয়েছে দেশে বিভিন্ন প্রান্তে প্লট, ফ্ল্যাট। রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগও। বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে তথ্য গোপন করে আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছে ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। এমন সব অভিযোগের ফিরিস্তি জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। গত ৫ জানুয়ারি এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করে কোটি কোটি টাকা আয়কর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ জমা পড়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে।

ওই অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ও তার সহযোগী ছয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামগ্রী বিভিন্ন প্রেসে ছাপিয়ে প্রতি মাসে অন্তত দুই কোটি টাকার বিল পরিশোধে ভ্যাট ফাঁকি দেয়। একই সঙ্গে ভ্যাট ফাঁকি দিতে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রানজেকশন প্রোফাইল (টিপি) মূল্যের প্রকাশ করে ২০ শতাংশ। কিন্তু পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে পণ্যের পরিমাণ ও প্রতিটি পণ্যের প্রকৃত বিক্রি মূল্য যাচাই করলেই এর সত্যতা মিলবে।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের নামে-বেনামে রয়েছে জায়গা, প্লট ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগও। বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে তথ্য গোপন করে আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছে ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। সম্প্রতি দুদকে জমা পড়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে এসব তথ্য।

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়, চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির সাফ রিমরোজ দুই নম্বর রোডে ১৭ নম্বর বাড়িতে ৬/ই ২টি ফ্ল্যাট, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ইলিজি অর্কিড দুই নম্বর রোডে ২৭ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির দুই নম্বর রোডে জুমাইরা হোল্ডিং লিমিটেডে ৩৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটসহ সোসাইটিতে রয়েছে আরও তিনটি ফ্ল্যাট (যার নম্বর বি/৩, সি/৩ ও ডি/৪)।

এছাড়া নগরীর বায়েজিদ রোডের আরেফিন নগর সানমার গ্রিনপার্ক রয়েছে ফ্ল্যাট, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির হোল্ডিং নম্বর ১৯২/১২/৫০০ নম্বরে চতুর্থ তলায় রয়েছে ফ্ল্যাট, ষোলশহর বিসিক আই/এ, ব্লক এ ব্লু একোয়া ড্রিকিং ওয়াটার রয়েছে একটি ফ্ল্যাট এবং ইনোভেটিভ ভুঁইয়া অর্কিড লেভেল ১ এর ১০২৫/এ নম্বরের ফ্ল্যাট।

সম্প্রতি দেশের বাইরে দুবাই ও কানাডায় বিপুল বিনিয়োগের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও ক্লাবের মধ্যে রয়েছে—দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড, ডেল্টা হেলথ কেয়ার চিটাগাং লিমিটেড, রামু গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব কক্সবাজার, চিটাগাং খুলশী ক্লাব লিমিটেড, কুমিল্লা ক্লাব, চিটাগাং বোট ক্লাব, শাহীন গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব, ভাটিয়ারী গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব ও অফিসার্স ক্লাব।

এছাড়া চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অফ বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সদস্য। এসব ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানের সদস্য পদ নিতেও তিনি দিয়েছেন মোটা অংকের টাকা।

অভিযোগ বিবরণে আরও বলা হয়, কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের নামে রয়েছে বিলাসবহুল একাধিক গাড়ি। এসব গাড়ির তালিকায় রয়েছে টয়োটা প্রিমিও চট্টমেট্রো-গ-১৩-৭৭০৭, টয়োটা স্কয়ার চট্টমেট্রো-চ-৫১-২৯১৫, টয়োটা প্রাডো-চট্টমেট্রো- ম-০০-০১২০, বিএমডাব্লিউ-চট্টমেট্রো-গ-১৩-৬৬৯৯, বিএমডাব্লিউ-চট্টমেট্রো-গ-১১-৩৪১৪, টয়োটা এক্স ফিল্টার-চট্টমেট্রো- গ-১৩-৫২২১, টয়োটা হেরিয়ার-চট্টমেট্রো-গ-১১-৩৫৯১, টয়োটা হেরিয়ার-চট্টমেট্রো-গ-১১-৪৬০২, টয়োটা হেরিয়ার- চট্টমেট্রো-গ-১১-৩০৯৫, টয়োটা ভিট-চট্টমেট্রো-গ-১১-২৪৩০, মিটসুবিশি পাজেরো-চট্টমেট্রো-গ-১১-৪০১১। এছাড়াও কোম্পানির মালিকানাধীন ছোট-বড় মিলে ২০/২৫টি কাভার্ড ভ্যান রয়েছে।

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এসব গাড়ি কিনলেও আয়কর বিবরণীতে শুধুমাত্র একটি বিএমডাব্লিউ গাড়ি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ গেছে দুদকে। তবে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিনের দাবি, আয়কর বিবরণীতে দুটি বিএমডাব্লিউর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়, কোম্পানির পরিচালক পদে থাকা মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন, তাসনিম মাহমুদ, মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন, শওকত আরা হক ও তাসনুবা আফরিনকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের ব্যাংক হিসাবও তদন্তের মাধ্যমে আয়কর-ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি বেরিয়ে আসতে পারে।

একনজরে ব্যাংক হিসাবের একাংশ

মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, যার ইস্টার্ন ব্যাংক লি. এর হিসাব নং-০০৮১২৫০০০০৮২, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের নামে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকে হিসাব নম্বর ০২৬১০২০০১৪৬০৩, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক হিসাব নম্বর ১০৯১০২০০০৪৩৬৭, ব্যাংক এশিয়ায় হিসাব নম্বর ০৩৪৩৩০০০৬৫০, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডে ১১০৮২০২৬৩৪৬৪০০০১, সিটি ব্যাংক লিমিটেডে ১০২৮৯৫৪৩২০০১, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডে ০০৯০২১০০০২২৪৬, এলবিয়ন স্পেশালাইজড লিমিটেডের নামে যমুনা ব্যাংক লিমিটেডে হিসাব নম্বর ০২৮০৩২০০০১২২৩, এলবিয়ন ট্রেডিং কর্পোরেশনের নামে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডে হিসাব নম্বর ০০৭১০৭০০০০০৪২, সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসোর নামে সিটি ব্যাংক লিমিটেড হিসাব নম্বর ১৫০২৪৯৫৭৯৪০০১।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, বর্তমানে ২২৫ ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে এলবিয়ন ফার্মাসিউটিক্যাল ও এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ। তার মধ্যে ৯০ ধরনের ওষুধে অ্যানিমেল মেডিসিন রয়েছে। ওষুধ শিল্পের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয় আরও তাদের সহযোগিতা ১০টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া এলবিয়ন গ্রুপের পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব তল্লাশি, ক্রেডিট কার্ড ও দেশ-বিদেশে ভ্রমণের বিভিন্ন হোটেলের খরচের তথ্য এবং পাসপোর্ট তল্লাশি করলে বিশাল অঙ্কের কর ফাঁকির তথ্য উদঘাটন হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রাইসুল উদ্দিন সৈকত আরও বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কোনো লোক হয়তো ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, যা করছি নিয়ম মেনে করছি। – চট্টগ্রাম প্রতিদিন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ