অর্থনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার সম্পর্ক নেই : মাসরুর আরেফিন

কোনো সন্দেহ নেই, পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতো আমাদের এখানেও একটা অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছে। তেমনই কোনো সন্দেহ নেই, এই সঙ্কটের আগাপাশতলা না বুঝেই কিছু লোক খারাপ উদ্দেশ্যে বার্তা দিচ্ছে ব্যাংকের টাকা তুলে নেবার, কিম্বা হিসাব দিচ্ছে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে আপনি আপনার আমানতের কতটুকু খোয়াবেন। আমার এ লেখা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে অস্বীকার করার জন্য নয়। সেই সঙ্কটের সমাধান যদি জানতে চান, তাহলেও এটা পড়ে আপনার লাভ নেই। কিন্তু ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেবার মতো কোনো যৌক্তিক পরিস্থিতির মোটেই সৃষ্টি হয়েছে কিনা, সে বোঝাবুঝিটা যেন আপনি করে নিতে পারেন, সেই কারণেই এই লেখা।

‘দেশ শ্রীলঙ্কা হচ্ছে‘ গুজব ছড়িয়ে যারা দেখল কোনো কিছুই শ্রীলঙ্কা হয়নি, তারাই এখন ‘ব্যাংকে টাকা নেই, আমানত তুলে নিন‘ বলে নতুন গান শুরু করেছে। দেশের বাইরে থাকেন এমন কিছু ‘অর্থনীতিবেত্তা‘ উদ্বেগ ফেরি করে যাচ্ছেন ফেসবুক-ইউটিউবে, আর দেশে বসে অনেকে ওই ফেরির মালটাই বেচছেন আরও গলা ছেড়ে। দেশের গভর্নর এ অবস্থায় জানিয়ে দিয়েছেন ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট নেই, বরঞ্চ অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, যে-ডলার সংকট তৈরি হয়েছে তা আগামী জানুয়ারি থেকে আর থাকবে না। তারপরও ব্যাংকে নতুন আমানত আসছে না, পুরোনো আমানত বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

সমস্যা কোথায়? দেশের গভর্নরের দেওয়া তারল্যের হিসাবে মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না? কারণ, তারা জানে না ‘তারল্য‘ মানে কী? নাকি ব্যাংকে ডলার নেই কিম্বা ব্যাংক এলসি খুলছে না জাতীয় কথার ব্যাখ্যা তারা করেছে যে, ব্যাংকে টাকাই নেই? আমার ধারণা, কোনো গুজবের কান এবং চিল দুটোই যখন দৃশ্যমান থাকে না, তখন অসুস্থ আলোচনার মধ্য দিয়ে সাধারণ জনমানসে ছড়ায় শুধু আতঙ্ক। সুস্থ আলোচনায় এ মুহূর্তে প্রশ্নটা আসলে আসা উচিত ছিল এমন যে—এই সংকট কি দীর্ঘমেয়াদি? তার বদলে প্রশ্ন আসছে: দেশের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ, অতএব আমার টাকা কি এখন ব্যাংকে নিরাপদ? ভুল প্রশ্ন নিয়ে আমরা বিচলিত হচ্ছি। প্রশ্নটা ভুল, কারণ এ প্রশ্নের সঙ্গে বর্তমান সঙ্কটের সম্পর্ক অনেক দূরের। আমার এ লেখার তাগিদ সে ভুল ভাঙানোর তাগিদ। দুটো বিষয় যে আসলে সম্পর্কিত নয়, তা আপনাকে জানানোর তাগিদ।

প্রশ্ন হল, মানুষ ব্যাংকে টাকা কেন রাখে? মোটা দাগে মানুষ কাজটা করে তিন কারণে। এক. ব্যাংকে টাকার নিরাপত্তা মেলে; দুই. চাহিবামাত্র সেই টাকা তোলা যায়; তিন. কিছু মুনাফা বা সুদ পাওয়া যায়। বুঝলাম দেশের রিজার্ভ কমছে, ডলার মার্কেটের তারল্য কমছে, বুঝলাম টাকা দিয়ে ডলার কিনতে সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু টাকার তারল্য কি কমেছে? সোজা উত্তর, না। এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় যে পরিমাণ তারল্য থাকার কথা, তার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে আরও ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার। এই পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য জমা আছে মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে, তাছাড়া ব্যাংকে নগদ আকারে। সে বিষয়ে বিস্তারিত বলবার আগে জানাই তারল্য বিষয়টা কী?

এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংকগুলোতে জমা থাকা মোট আমানত বা ডিপোজিটের পরিমাণ ১৪ লক্ষ ৮২ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীদের ওই টাকা চাহিবামাত্র ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা পরিমাপের অন্য নাম—ব্যাংকের তারল্য। আমাদের এই তারল্যের পরিমাণ বর্তমানে ৪ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু হিসাব মতে আমাদের এই তারল্য থাকা লাগতো আড়াই লক্ষ কোটি টাকার মতো। অন্য কথায়, নিয়মমাফিক দেশের মোট আমানতের ১৭ শতাংশ টাকা নিরাপদে তুলে রাখবার জায়গায় আমরা রেখেছি ২৮ শতাংশ টাকা। এরকম উদ্বৃত্ত তারল্য বিদ্যমান থাকতে আপনি লোকের কথা শুনে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে রাখবেনটা কোথায়? বাসায়? বাসা কি ব্যাংকের চাইতে নিরাপদ? সত্য একটা ঘটনা বলি। এই সেদিন আমাদের এক জেলা শহরের শাখা ব্যবস্থাপক জানালেন, তার এক গ্রাহক ১৩ লাখ টাকা বাসায় নিয়ে গেছেন, কারণ তার ইতালি প্রবাসী ভাই বলেছেন ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ না। দু সপ্তাহ পরে তিনি ব্যাংকে ফিরে এসেছেন ৯ লাখ টাকা নিয়ে। বাকি ৪ টাকা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না, সেটা চুরি হয়ে গেছে।

ওই শাখা ব্যবস্থাপকের মতো শেকড় পর্যায়ে কাজ করা ব্যাংকারদের থেকেই আমি জানছি, যারা দেশের বাইরে থাকেন তাদের মধ্যে এ উৎকণ্ঠা তুলনামূলক বেশি। প্রবাসীরা দূরে বসে সোশাল মিডিয়ায় ব্যাংকে টাকা রাখা বা না রাখা নিয়ে ‘জ্ঞানগর্ভ’ আলোচনা শোনেন, আর একসময় দুশ্চিন্তার কাছে হার মেনে দেশে আত্মীয়কে ফোন দেন টাকা তুলে ঘরে রেখে দেবার জন্য।

এ পুরো ব্যাপারটা আমাদের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত শক্তিটাকে বুঝতে না পারার ব্যাপার। সিকি-সত্য বা অপ্রাসঙ্গিক সত্যকে অকাট ও প্রাসঙ্গিক সত্য ধরে নিয়ে প্রয়োজনের চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলবার ব্যাপার। তো, সত্য-মিথ্যার এই উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চে যা মঞ্চস্থ হচ্ছে তার ফলাফল যদি হয় বাস্তবতাবর্জিত প্যানিক, তাহলে তার চাইতে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।

দেখুন, ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনার একটা বড় তত্ত্ব হলো যে, সব আমানতকারীদের একসঙ্গে সব টাকা নগদ করার কোনোদিন দরকার পড়ে না। এটা চিরন্তন এক সত্য। গ্রাহকদের ব্যাংকে রাখা সঞ্চয় যদি সবার একসঙ্গে দরকার পড়তো, তাহলে পৃথিবীতে ব্যাংকিং বলে কোনোকিছুর আবিষ্কারই হতো না। ব্যাংক আপনার আমানত নিয়ে অন্যকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেয় বলেই মানুষ ঋণ নিয়ে তার ব্যবসার আকার বড় করে বা বাসস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ‘হোম লোন‘ নেয়। এখন সব আমানতকারী যদি এসে বলেন যে, ‘সব টাকা ফেরত দাও‘, তাহলে ব্যাংকগুলোকে সকল ঋণগ্রহীতার কাছে গিয়ে বলতে হবে, ‘আপনার ফ্যাক্টরি বা বাড়ি বিক্রি করে সব টাকা ফেরত দিন‘। সেটা অবাস্তব। এখন প্রশ্ন আসে, পুরো টাকাটা ব্যাংক থেকে মানুষ একযোগে তুলে না নেয় তো, কতটা নিতে পারে? ইতিহাস এ ব্যাপারে কী বলে? সামগ্রিক অর্থনীতির সমূহ পতন কিংবা বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলে এমন কোনো উদাহরণ নেই যে, ব্যাংক খাত থেকে মোট আমানতের ১০-১২ ভাগের বেশি টাকা একযোগে বা এক মৌসুমে বেরিয়ে গেছে। সেখানে, ওপরেই বললাম, আমরা এ দেশের গ্রাহকদের মোট আমানতের ১৭ ভাগ টাকা রক্ষিত রাখার বদলে রেখেছি ২৮ ভাগ।

মোদ্দা কথা, পৃথিবীর কোনো দেশই তার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জনগণের রাখা মোট আমানত নিয়ে চিন্তিত থাকে না। আমরাও ১৪ লক্ষ ৮২ হাজার কোটি টাকার মোট আমানত নিয়ে চিন্তিত নই। আমাদের দেশের ‘রিজার্ভ মানি‘-র পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা থেকেই কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে ওই ১৪ লক্ষ ৮২ হাজার কোটি টাকার ডিপোজিট। ১৪ লক্ষ ৮২ হাজার কোটিকে এখন ৩ লক্ষ ৪১ হাজার দিয়ে ভাগ দিন, দেখবেন ফল এসেছে ৪.৩৫। এটাই ‘মানি মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট‘। অর্থাৎ ‘রিজার্ভ মানি‘-র ৪.৩৫ গুন টাকার ডিপোজিট তৈরি হয়েছে এ দেশে। তত্ত্বে বলে, আমাদের আদর্শ মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট হওয়া উচিত ৫.৮৮ গুন। আবার তত্ত্বেই বলে, ৪.৩৫ গুন যথেষ্ট ভাল এক অঙ্ক। কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক গতিশীলতা যত বাড়বে, তত এটা আদর্শের (৫.৮৮ গুন) বেশি কাছে যাবে। তার মানে আপনার ১০০ টাকা আপনি ব্যাংকে জমা রাখলেন, ব্যাংক সেখান থেকে ১৭ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করে বাকি ৮৩ টাকা ঋণ হিসেবে আপনাকে দিয়ে দিল; আবার আপনাকে দেওয়া ঋণের ওই ৮৩ টাকা ঘুরে ডিপোজিট হিসেবে ব্যাংকেই ফিরে এলো; আবার সেখান থেকে ১৭ শতাংশ জমা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে; আর এ দফায় বাকি ৬৮.৮৯ টাকা গেল নতুন অন্য কোনো ঋণে; আবার…আর এভাবে ৪.৩৫ বার হাত ঘুরে সেই প্রথমবারের কেবল ১০০ টাকা শেষে গিয়ে সৃষ্টি করল ৪৩৫ টাকার ডিপোজিট।

এ কথা বললাম এই জন্য যে, আমরা মোট আমানতের ১৭ ভাগের বদলে ২৮ ভাগ নিরাপদে তুলে রেখে আপনার টাকাকে ‘বাড়তি‘ নিরাপত্তা দিতে গিয়ে এমনকী অর্থনৈতিক গতিশীলতাও কিছুটা কমিয়ে ফেলেছি। তা-ও আপনার টাকা নিরাপদে থাকুক, সেটাই বড় কথা। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয় টাকা রাখার নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে তাই বৈশ্বিক হিসেবেই শীর্ষমানের, কারণ তারল্য এতটা বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও‘ (তারল্য সংরক্ষণ অনুপাত) থাকা লাগে ১০০%, আর সেখানে আমাদের দেশে এ বছর জুনের শেষের এই রেশিও ছিল ১৬৫.৫৬%।

এবার ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংক’ নামের একটা বিষয়ে কিছু কথা বলি। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরের টাকা। আপনি আপনার ব্যাংক একাউন্ট থেকে ১০০ টাকা তুলে নিলে এই ১০০ টাকাকে বলা হয় ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংক’, যে টাকার অর্থনীতিতে গভীর অবদান রাখার ক্ষমতা তুলনামূলক কম। এটাই আপনার দৈনন্দিন লেনদেনের টাকা। এ মুহূর্তে লেনদেনে ব্যবহৃত আমাদের এই টাকার পরিমাণ ২ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি। এবার আপনি ব্যাংক থেকে টাকা অহেতুক তুলে নেবেন, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন দেখবে এর ফলে দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যবহৃত টাকার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, তখন মুদ্রানীতিতে আগের বলা ‘রিজার্ভ মানি‘-র প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে তাদেরকে ‘মানি সাপ্লাই‘ বাড়াতেই হবে। আর সে সঙ্গে কিন্তু বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি, যে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব পড়বে আমার-আপনার মতো সাধারণ জনগণের ওপরে। ব্যাংক থেকে অকারণে টাকা তুলে নেবার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার বাড়িটা তাহলে কোথায় গিয়ে পড়ছে? সেটা ঘুরে গিয়ে পড়ছে জনগণেরই ঘাড়ে।

এই কথাটার ওপর এবার অন্য দিক থেকে আরেকটু আলো ফেলি। আগেই দেখিয়েছি এদেশের ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদের পরিমাণ প্রয়োজনের চাইতেও বেশি আছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে চাহিবামাত্র টাকা পাওয়ার গ্যারান্টি এখানে বিদ্যমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে আসলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাটা করতে পারছে, যেহেতু আপনার টাকা আপনি বাসায় না নিয়ে ব্যাংকব্যবস্থায় রাখছেন। এজন্যই দেখবেন আমেরিকা, ইউরোপ সবখানে ‘ক্যাশলেস সোসাইটি‘-র কথা বলা হয়। আমাদের এখানেও এখন তা হচ্ছে। আপনি ক্রেডিট কার্ডে টাকা খরচ করলে টাকাটা মানি মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্টের কাজেই লাগছে, মানে অর্থনৈতিক গতিশীলতায় সেটা ভূমিকা রাখছে। আর আপনি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নগদ টাকা বালিশের নিচে রেখে দিলে কিম্বা লেনদেনে ব্যবহার করলে মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ উপযোগিতাটার দেখাচা আমাদের মিলছে না। মানি মাল্টিপ্লায়ার যত বেশি, সেই অর্থনীতি তত দক্ষ। ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে নিয়ে সেই অর্থনৈতিক দক্ষতার ক্ষতি করাটা আমাদের কারোরই উচিত না।

এবার আসি যারা ভুল বার্তা ছড়াচ্ছেন, তাদের কিছু উটকো যুক্তি প্রসঙ্গে। প্রথমে বলি বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে। ২০১৮-১৯ সালে আমাদের রিজার্ভ ছিল ৩২.৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০ এটা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৬.০৩ বিলিয়ন ডলারে। এরপরে করোনার মধ্যে অবৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ানোয় বৈধ চ্যানেলে বিপুল রেমিট্যান্স আসতে থাকে, আর তাছাড়া ব্যাংকগুলো অনেক আমদানি ব্যয় পরিশোধকে ‘ডেফার্ড‘ বা প্রলম্বিত করায় ২০২০-২১ সালে এই রিজার্ভ উঠে যায় ৪৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু করোনা শেষে অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা কমতে শুরু করে এবং একইসাথে ‘ডেফার্ড‘ আমদানি পরিশোধের দায় মেটাতে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়া শুরু হয়। কিন্তু এর অর্থ এই না যে, দেশের রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে বা আগামী কয়েক মাস আমদানি ব্যয় ও বিদেশী লোনের কিস্তি মেটানোর মতো ডলার দেশে নেই। মনে রাখবেন, ২০২১ সালে জার্মানি, কানাডার মতো দেশেরও রিজার্ভ এসে ঠেকেছিল তাদের মাত্র ২ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর পর্যায়ে। আসলে অতদূর যাওয়া লাগবে না। ১৯৯১ সালে বাড়ির পাশের ভারতই এর চেয়ে কত তীব্র এক সঙ্কটের মুখে পড়েছিল। সে বছরের জানুয়ারি থেকে জুন, মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে, ভারতের রিজার্ভ প্রায় ৫০% কমে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। সঙ্কট এতটাই প্রকট ছিল যে, তখন আমদানি ব্যয় পরিশোধের সামান্য সক্ষমতাটুকুও ভারতের ছিল না। সেবার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে ভারত সে সঙ্কট কাটিয়ে উঠেছিল খুব চমৎকারভাবেই। এখানে উল্লেখ্য, ভারত সেদিন যে লোনটা পেয়েছিল, তা ছিল স্বর্ণের বিপরীতে পাওয়া ‘সিকিওরড’ লোন। আর আমরা আইএমএফ থেকে যে লোন পাচ্ছি, সেটা কিন্তু অমন কিছু বন্ধক রেখে পাওয়া কোনো লোন না।

রিজার্ভের পরে আসি জিডিপির বিপরীতে ঋণের (সরকারের স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া সর্বমোট ঋণের) অনুপাতে, যাকে বলা হয় ‘ডেট (debt) টু জিডিপি রেশিও’। এই রেশিও দিয়ে মাপা যায় একটা দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী। এ রেশিও যত কম হবে, তত বেশি কোনো দেশ ঋণ নেয়া ছাড়াই উন্নতি করতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ‘ডেট টু জিডিপি রেশিও‘ যদি ৭৭% বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে সে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী বলা যাবে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী আমাদের এই ‘ডেট টু জিডিপি রেশিও‘ ৩৬%-এরও কম। অথচ ২০২১ সালের হিসাব মতে একই রেশিও ভারতের বেলায় ৯১%, কানাডার ১১০%, আর যুক্তরাষ্ট্রের ১৩৩%। এই পরিমাপক থেকেও বলা যায়, আমরা আইএমএফ-এর লোন পরিশোধ করতে এবং একইসঙ্গে বিদেশি গ্রাহকদের কাছে আমাদের পণ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম।

সরকারের নেওয়া সর্বমোট ঋণের পরে এবার আসি শুধু বিদেশী ঋণ প্রসঙ্গে। কিছু লোক বলতে শুরু করেছেন যে, দেশ নাকি বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে না। আমাদের বিদেশি ঋণ জিডিপির মাত্র ২০.৪%, যেখানে ভারতের ১৯.৪%, আমেরিকার ১০০.২%, জাপানের ৯৭.৯% এবং সিঙ্গাপুরের ৪১৮.৩%। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় আমাদের এই ‘লোন টু জিডিপি রেশিও‘ অনেক কম। তবে এটা ঠিক যে, গত কয়েক বছরে আমাদের এই ঋণ বেড়ে গেছে।

কিন্তু এখানেও আইএমএফ-এর প্রসঙ্গটা চলে আসে। একজন ব্যাংকার হিসেবে বলতে পারি, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আপনার না থাকলে আমি আপনাকে ঋণ দেব না। তাহলে আইএমএফ আপনাকে কেন দেবে? আবার আমরা শুধু আইএমএফ-এর ঋণই পাচ্ছি না। বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান, সবাই আমাদেরকে ঋণ দিতে আসছে। এদের ঋণ অনুমোদন এটাই প্রমাণ করে যে, বিদেশিরা বাংলাদেশকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে না। আর আপনি কিনা আপনার নিজের দেশের বাড়তি তারল্যসম্পন্ন ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে ভয় পাচ্ছেন?

আমাদের বর্তমান সংকট মূলত একটা স্বল্পমেয়াদী বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির সঙ্কট। আইএমএফ-এর লোন পাওয়ার মাধ্যমে সেই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত থাকুন ঠিক আছে, কিন্তু সেই সুস্থ চিন্তার বদলে গুজবে ভর করে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বার কোনো কারণ দেখি না। আসলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী হতে আপনি বাধ্য, যেহেতু ক্রমবর্ধমান রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয়ের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে আমাদের আমদানি বৃদ্ধিই পাচ্ছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বেড়ে এটা যে বড় একটা অর্থনীতিতে রূপ নিয়ে ফেলেছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের যে বিশাল অর্থনীতি আমরা তৈরি করেছি, তা আপনি মনে করেন উধাও হয়ে যাবে? রেমিট্যান্স আয় কিছুটা কমে যাবার কারণে দেশের অন্য সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে? ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে? মনে রাখবেন, নতুন লাখো রেমিট্যান্স যোদ্ধা পুরো দমে বিদেশে যাওয়া শুরু করেছেন। অতএব প্রবাসী আয় সামনের দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ওপরে ভরসা রাখুন। আর প্রবাসী আয় যেই বাড়বে, ডলার সঙ্কট সেই শেষ। আবার অন্যদিকে সামনে রপ্তানিও বাড়বে, নিশ্চিত।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য আমাদের তৈরী পোশাক, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগ। আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশী ডেনিমের প্রবৃদ্ধি চীন বা ভিয়েতনামের চাইতেও বেশি। ইদানিংকালের আমেরিকা-চীন বাণিজ্যিক বিরোধের জের ধরে আমেরিকার বাজারমুখী পণ্যের রপ্তানি আদেশ চীন থেকে সরতে শুরু করেছে। এসব আদেশের পছন্দের তালিকায় এখন প্রথম দেশ হবে বাংলাদেশ। বিশ্ব যেই না বর্তমানের এই অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠবে, সেই দেখবেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়ে গেছে। সে কারণেই বিজেএমইএ ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের তৈরী পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার।

এখন এ সময়ের খুব বাজার-চলতি একটা প্রসঙ্গে আসি। কারও কারও দাবি এমন যে, ব্যাংকগুলোর কাছে বৈদেশিক বাণিজ্যের দায় মেটানোর মতো ডলার নেই। কিন্তু দেখুন, আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স—এ তিন সেক্টরেই গত বছর থেকে এই বছর অগ্রগতি বেশি। গত অর্থবছরের জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর এ তিন মাসে রপ্তানি ছিল ১১.০২ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ১৭.৩২ বিলিয়ন ডলার ও রেমিট্যান্স আয় ৫.৪১ বিলিয়ন ডলার, যা এ অর্থবছরের একই তিন মাসে যথাক্রমে ১২.৫০ বিলিয়ন, ১৯.৩৫ বিলিয়ন এবং ৫.৬৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সমস্যা আছে একটা। দেশের চলতি হিসেবে ঘাটতি ১.০৬ বিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে। তার মানেটা কী? মানে হচ্ছে, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স আয় যে হারে বেড়েছে, আমদানি বেড়েছে তার চাইতে বেশি। একই জিনিস যা আগে বিদেশ থেকে কিনতাম ধরুন ১০০ ডলারে, সেটাই বৈশ্বিক বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আপনাকে কিনতে হচ্ছে ১৩০-১৪০ ডলারে। মজা করে বললে, এই বাইরে থেকে ‘আমদানি‘ হয়ে আসা ঘাটতির কারণেই ব্যাংকগুলো এখন কিছুটা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু টাকা দিয়ে ডলার না কিনতে পারার সঙ্কট, আর দায় মেটানোর ডলার তারল্য না থাকার সঙ্কট এক জিনিস না। একটার সঙ্গে আরেকটাকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য এক জিনিস আর বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়ম আরেক। আমরা ব্যাংকাররা আমদানি দায় মেটাতে দুটো পদ্ধতিরই আশ্রয় নিয়ে থাকি। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হয়। আবার তা যদি না পারা যায়, তখন আমরা আমাদের যার যার ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য দিয়ে সেই দায় পরিশোধ করি, আবার পরে সুযোগমতো টাকা দিয়ে ডলার কিনে ব্যাপারটার শোধবোধ করি বা—ব্যাংকিং পরিভাষায়—আমাদের ‘পজিশন স্কয়ার’ করি।

ডলার নেই কথাটা একটা ভুল কথা। আমরা ডলার থাকার সক্ষমতা থেকেই আমাদের আমদানি দায় মেটাচ্ছি এবং এর ফলে কখনও কখনও আমাদের পজিশন ‘শর্ট’ (ঘাটতি) হয়ে যাচ্ছে, সত্য। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার পজিশন ‘শর্ট‘ হওয়া দিয়ে কোনোভাবেই কোনো ব্যাংকের অক্ষমতাকে বোঝায় না। এটা চলমান অর্থনীতির উঠতি-পড়তির এক ধারা। এই যেমন এখন আমদানি শেষমেশ কমতে শুরু করেছে। অন্য কথায়, হুন্ডির ফাঁদ এড়িয়ে আসল দরে বিদেশের সঙ্গে মালের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বেচে আমাদের ওই ঘাটতি উপশমের চেষ্টাও করে যাচ্ছে। সামনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া নানা ধরনের পদক্ষেপের ফলে ২-৩ মাসের মধ্যে এই সাময়িক সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে, সেটা দেশের গভর্নরেরই স্পষ্ট আশাবাদ।

এই সার্বিক শক্তিশালী অবস্থায় ব্যাংকের আমানতকারীদের এত চিন্তিত হবার কোনো কারণ দেখছি না। এলসি খোলার বেলায় ব্যাংকগুলো যে সাময়িক কড়াকড়ি করছে, তাতে ব্যাংকের একজন আমানতকারী হিসেবে আপনার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। এলসি হলো ব্যাংকের বৈদেশিক ব্যবসা, আর আমানতকারীদের টাকা আমরা বিনিয়োগ করেছি মূলত লোন হিসাবে। এলসি খুলতে না পারার কারণে ব্যাংক কখনও দেউলিয়া হয় না। এতে ব্যাংকের মুনাফা কিছুটা কমে, ওই যা।

এখন আপনি কথা তুলতে পারেন লোনগুলোর খারাপ অবস্থা নিয়ে। ব্যাংকের সব লোন কখনোই একসঙ্গে খারাপ হয় না, হবেও না। ব্যাংক সবসময়েই একটা শক্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে তার ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আমাদেরকে কড়া নজরদারিতে রাখে। বলতে পারেন তাহলে কোনো কোনো ব্যাংকে এতো মন্দ ঋণ কেন? আর কেন পত্রিকায় এতো নেগেটিভ খবর পাওয়া যায় দেশের ব্যাংকগুলো নিয়ে? এর কারণ, যেহেতু ব্যাংকগুলো কড়া নজরদারির মধ্যে থাকে, সেহেতু সেখানে কোনো অনিয়ম ঘটলেই তা দ্রুত সবার নজরে চলে আসে। এটাকে আমি ব্যাংকিং খাতের একটা বড় শক্তি বলেই মনে করি।

সব মিলে, হঠাৎ করে দেশের এই সর্বাধিক নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখ থুবড়ে পড়বার কোনো কারণ নেই। পাশাপাশি এটাও বলে রাখি, এই নভেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনে এলসি খোলা হয়েছে ১.২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যা গত মাসের এ সময়ে ছিল ১.২৩ বিলিয়ন ডলার। তার মানে প্রয়োজনীয় এলসি যে আমরা খুলছি না, সেটাও আরেক গুজব।

শেষ কথা:
বাংলাদেশ মজবুত এক অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের বড় অর্থনীতির দেশ। সমস্যা যে নেই, তা না। কোনো কোনো ব্যাংকে মন্দ ঋণের সমস্যা আছে, কোথাও সুশাসনের সমস্যা আছে। তাই বলে আপনার টাকা তুলে নেবার মতো পরিস্থিতি! তার প্রশ্নই ওঠে না। উঠলে এতদিনে এ দেশে দু-একটা ব্যাংক ধসে যেত। যায়নি কারণ আপনার সব সমালোচনার পরেও ব্যাংক ব্যবস্থায় রয়েছে ওই তারল্য ও উদ্বৃত্ত তারল্যের উপস্থিতি, আর রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কড়া চোখ। এ সময়ে কিছু স্বল্পস্থায়ী সমস্যাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আপনার একাউন্টের টাকা যারা অকারণে আপনাকে ব্যাংক থেকে তুলে নিতে বলছে, তারা আপনার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই করছে না। সে ক্ষতিটার শিকার যাতে আপনি না হন, তাই ওপরের এতগুলো তথ্য-উপাত্ত-অঙ্ক। অঙ্কই কথা বলুক, আর কথা বলুক আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ইতিহাস।

About bdsomoy