ব্রেকিং নিউজ

নীরবে বৈশ্বিক মহামারি জয় করে বেঁচে আছেন যারা : সায়েমা ওয়াজেদ

 নারীদের অধিকার, নারীবাদ ও লিঙ্গ সংক্রান্ত ইস্যু কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই চলমান বিষয় এবং এগুলো বেশ জটিল। আমাকে নারীদের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে লিখতে বলা হয়েছে। কিন্তু শুধু করোনা নয়, আমি নারীদের সাধারণ পরিস্থিতি নিয়েই লিখতে আগ্রহী। আমি মনে করি, এর মাধ্যমেই নারীদের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আমি একজন নারী। আমি মনে প্রাণে বাঙালি। তবে বহু সংস্কৃতির অংশ হওয়ার সুযোগ আমি পেয়েছি। আর এই বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে কেবল পদমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। বরং আমি এই সমস্যার সমাধান খোঁজারও চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এখন শুরুতেই প্রশ্ন ওঠে— বাংলাদেশের সংবিধানে যেভাবে বলা হয়েছে এবং আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে চেয়েছিলেন, সেভাবে কি বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ও আইনি সুরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রগুলোতে নারীরা সমান অধিকার পাচ্ছেন?

দেড় দশক আগের কথা। স্নাতক থিসিসের জন্য বাংলাদেশের নারীদের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা নিয়ে আমাকে গবেষণা করতে হয়েছিল। ওই গবেষণায় দেখতে পাই, নারীরা চাকরির চেয়ে শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু যে সব নারীরা চাকরি করছেন, তারা নিজেরা আয় করলেও সেই আয়ের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এছাড়াও নারীদের পর্দার নামে বৃহত্তর সামাজিক স্বাধীনতা থেকে দূরে রাখা হতো। কোনো কাজ করার জন্য নারীদের অনেকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হতো।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৈশোর থেকেই নারী-পুরুষ সমতার কথা বলেছেন। তিনি নারীদের রাজনৈতিকভাবে এবং দেশের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা এবং সমর্থন দিয়ে গেছেন তিনি।

নারীরা যেন ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে, স্বাধীনতার পর থেকেই সে লক্ষ্যে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে কেবল প্রধানমন্ত্রীই নারী নন, বরং দেশ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেই রয়েছেন নারীরা। যেমন— জাতীয় সংসদের স্পিকার একজন নারী। এছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী। বিচার বিভাগসহ শিক্ষকতা, এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবেও নারীরা কাজ করছেন। এছাড়া করপোরেটসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে। নারীদের বিয়ের বয়স, ধর্ষণ ও নির্যাতন নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার।

বাংলাদেশের নারীদের জীবনধারার পরিবর্তনের স্তম্ভ বলা চলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে। আশির দশকে দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান শুরু হতে থাকে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবং দেশে কম পারিশ্রমিক ও যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ করাতে পারায় একের পর এক পোশাক কারখানা গড়ে উঠতে থাকে। এগুলো গড়ে ওঠার পর অবশ্য মানবাধিকারকর্মীরা অনেক প্রশ্নই তুলেছেন। তবে যেসব দরিদ্র পরিবারের নারীদের বোঝা হিসেবে দেখা হতো, এসব কারখানায় কাজ করার মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক মুক্তির সুযোগ পান। এতে পরিবারেও তাদের মর্যাদা বাড়ে। বাংলাদেশে কম শিক্ষিত নারীদের আরেকটি কাজের ক্ষেত্র হলো গৃহকর্মীর কাজ। পোশাক কারখানায় কাজ করার পাশাপাশি নারীরা যুগপৎভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের আয় বাড়ানোর সুযোগ পান।

এ ধরনের উল্লেখযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিকভাবে নাটকীয় উন্নতি অর্জন করেছে, সেটি অনস্বীকার্য। এই উন্নয়নে নারীরা যে ভূমিকা পালন করেছেন এবং দিনমজুর হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটিও অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। তবুও প্রশ্ন ওঠে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ ও চাকরিতেও তি নারীদের তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া হয়?

পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা এবং নিজেদের করণীয় বিষয়ে ভারসাম্য আনার জন্য নারীরা সবসময় সংগ্রাম করে আসছে এবং এখনো করছে। অনেকেই খুব সহজেই তাদের পছন্দ নির্বাচন করতে পারে। সমাজের যা প্রত্যাশা এবং প্রয়োজন, তারা আনন্দের সঙ্গেই সেগুলো করে থাকে। তবে কিছু মানুষের জন্য এটি সারাজীবন মানসিক অশান্তির জন্ম দেয়। মাতৃত্ব এবং একটি সফল ক্যারিয়ারের মধ্যে কোনটি একজন নারী বেছে নেবেন, সেটি আইন প্রণয়ন করে বলা সম্ভব নয়। এর জন্য সামাজিক প্রত্যাশা এবং শৈশবে শিশুদের দেখভাল ও নির্ভরতা নিয়ে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

বাংলাদেশের নারী, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের মধ্যে যে সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, সেটি পুরো বিশ্বেই রয়েছে। কিন্তু এটি একেক দেশে একেক রকম। আর এজন্যই একটিমাত্র উপায় বের করে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে আমরা সবাই বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু এটি এখন এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, কোনো কিছুই যেমন সহজ মনে হয়, তেমনটি নয়।

এই বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতিতে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য এমন একটি সমাধান বের করতে হবে যেখানে নারীরা তাদের সংস্কৃতির অনুযায়ী সেটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারবে। পক্ষপাতমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নারীদের আরও বিপাকে ফেলছে। এই সমস্যা সমাধান করতে আমাদেরকে নারীদের জন্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

আমাদের মাথায় রাখতে হবে, আইনি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য নারীদের যতটুকু আগ্রহের দরকার ছিল, তা নেই। নিজেদের স্বপ্নের কথা বলতে না পেরে এখনো অনেক রাজনৈতিক নারী নেত্রীই প্রতিদিন মনোকষ্টে ভুগে থাকেন। এই বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতিতে বিষয়টি সামনে তুলে ধরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক মাসে নারীদের ওপর ঘরোয়া সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। যেসব নারী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। তাদের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসছেন না। এটি কেবল আর্থিক দিক থেকে না, মানসিক দিক থেকেও তাদের ওপর প্রভাব ফেলছে।

[আইপিএস নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত কলাম থেকে অনূদিত]

লেখক: অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শক প্যানেলের সদস্য, বাংলাদেশের অটিজম ও এনডিডি বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন

About bdsomoy