বিশ^ পারিবারিক চিকিৎসক দিবস ও আমরা : ডাঃ লে. কর্ণেল মোঃ কবীর আহমেদ খান (অবঃ)

প্রতিবৎসর বিশে^র প্রায় প্রতিটি দেশে পারিবারিক চিকিৎসক দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়। আমাদের দেশে পারিবারিক চিকিৎসক ধারণাটি সুস্পষ্ট না থাকায় দিবসটি অনেকটা নিরবেই চলে যায়। বিশ^ পারিবারিক চিকিৎসক সংস্থা (World Organization of Family Doctors-WONCA) ২০১০ সালে ১৯ মে কে প্রতি বৎসর বিশ^ পারিবারিক দিবস পালনের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন এবং তার প্রত্যেকটি সদস্য এবং অনুগত সংস্থা সমূহকে পালনের আহ্বান জানান। পরবর্তীতে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা দিবসটিকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সকল অঞ্চলসহ সদস্য সংস্থা সমূহকে পালনের আহ্বান জনান। দিবসটি পালনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পারিবারিক চিকিৎসকদের অবদান, তাদের কাজের গুরুত্ব, সর্বোপরি সারা বিশে^র পারিবারিক চিকিৎসকদের জন্য এটি যোগসূত্র তৈরীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। দিবসটি পালনের ক্ষেত্রে প্রতি বৎসরই একটি বিষয়বস্তু (Theme) নির্ধারিত হয়, এই বৎসরের বিষয়বস্তু হলো “Family doctor: caring for you for the whole of your life” অর্থাৎ আপনার পারিবারিক চিকিৎসক আপনার স্বাস্থের যতœ নিবেন এবং তা সারা জীবনের জন্য। এ বিষয় বস্তুর মধ্যে পারিবারিক চিকিৎসকের মূল কাজের ধারা বিধৃত রয়েছে।

তাহলে পারিবারিক চিকিৎসক কারা? আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্য সেবার পিছনের দিকে তাকাই-সেখানে লক্ষ করবো একটা সময় ছিলো যখন পারিবারের সকল সদস্য স্থানীয় একজন ডাক্তারের কাছে তাদের সকল অসুখ বিসুখের চিকিৎসার জন্য যেতেন। যারা পারিবারিক এবং সামাজিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানীয় অবস্থানে থাকতেন। এ অবস্থা সারা বিশে^ই চলমান ছিল। কিন্তু একটা সময়ে যখন স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের পরিধি বাড়তে থাকলো এবং মেডিক্যাল প্রযুক্তি জ্ঞানও উন্নত হতে থাকলো-তখন ঐ চিকিৎসকরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় আরো জ্ঞান আরোহনের প্রয়োজন বোধ করলেন। ফল শ্রুতিতে স্বাস্থ্য সেবা সুনির্দিষ্ট ভাবে আলাদা হওয়া শুরু হলো। বিষয় আলাদা হতে থাকলো এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সংখ্যা বাড়তে লাগলো। প্রাথমিক অবস্থায় রোগীরা উৎসাহিত হলো তারা তাদের নির্দিষ্ট রোগে উচ্চ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক পেয়ে আবার চিকিৎসকরাও খুশী হলেন সুনির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান আহোরণ করে চিকিৎসা প্রদান করতে পেরে। কিন্তু অচিরেই রোগীরা দেখতে পেলেন তাদের সেই পুরনো ভাল বন্ধু চিকিৎসকটি আস্তে আস্তে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্র থেকে অদৃশ্য হতে থাকলো। যেহেতু সকল নবীন চিকিৎসকরাই হয় কোন না কোন বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলো এবং কাবীরাও বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞ হবার প্রতিযোগীতায় অহোরাত্রি নিয়োজিত থাকলো। পর্যায়ক্রমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ও আরো ভাগ হয়ে হয়ে শরীরের সুক্ষাতিসুক্ষ অংগের চিকিৎসক হতে থাকলো। আর তাদের বন্ধু চিকিৎসক এর জায়গা দখল করতে থাকলো বিকল্প চিকিৎসক, হাতুড়ে চিকিৎসক বা অস্থায়ী পারিবারিক চিকিৎসক যারা এ বিষয়ে যথেষ্ট উৎসর্গকৃত নয় এবং সব সময় কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবার দৌড়ে নিয়োজিত থাকেন। তখন জনগন আস্তে আস্তে তাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের এই ভাগাভাগির বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ হতে থাকলো। চিকিৎসক রোগী সম্পর্ক অবনতি হতে থাকলো। দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধের পর এ সংকট আরো ঘনিভূত হলো। তখন এই সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য সনাতন এই পারিবারিক চিকিৎসকদেরকে আরো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুযোগপযুগী ভাবে তৈরী করে তাদেরকে ও বিশেষজ্ঞ করার ব্যাপারে পরিকল্পনা গৃহীত হলো। যা সুনির্দিষ্ট পাঠক্রম ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি তৈরীর মাধ্যমে বিষয় নির্ধারিত হয়- ‘ফ্যামিলি মেডিসিন’ (FAMILY MEDICINE), যেখানে সার্বিক সন্ধন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্ণিত থাকবে। তাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন প্রফেসর আর. ম্যাক উইনী-যাকে ধ্রুপদী পারিবারিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী আমেরিকায় প্রথম ফ্যামিলী মেডিসিন-কে অন্যান্য বিষয়ের মতো স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ বিষয়ের মর্যাদা দেয়া হয়। তারপর পরই কানাডাতে তা চালু হয়। ১৯৭২ সালে (WONCA) প্রতিষ্ঠা লাভ করে-তারপর খুবই দ্রুত অন্যান্য দেশে ফ্যামিলী মেডিসিনকে তাদের মেডিক্যাল পাঠক্রমে অন্তর্ভূক্ত করে মেডিক্যাল কলেজগুলোতে আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক চিকিৎসক তৈরী শুরু হয়। ফ্যামিলী মেডিসিন আরো আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে আসে ১৯৭৮ সালে, যখন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা-‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’ কর্মসূচী চালু করে। যেখানে লক্ষ পূরণের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকে পারিবারিক চিকিৎসকের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে বলা হয়। পৃথিবীর সকল দেশ পর্যায়ক্রমে-ফ্যামিলী মেডিসিনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় ভাবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান পদ্ধতি ঢেলে সাজিয়েছেন। যেখানে জরুরী অবস্থা ছাড়া সকল রোগীকে স্থানীয় পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট প্রথমে যেতে হয়। সেখানে পরিবারের সকল সদস্য শিশু থেকে বৃদ্ধ, মহিলা-পুরুষ সহ নির্বিশেষে সকলেই সব ধরণের রোগ নিয়ে রিপোর্ট করতে পারবে।  বিভিন্ন গবেষণার দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত পারিবারিক চিকিৎসক প্রায় ৮০% রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা স্বাধীনভাবে দিতে পারেন। বাকীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেই রোগীকে বিশেষজ্ঞ নির্দিষ্ট চিকিৎসা শেষে সেই পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট আবার ফেরৎ পাঠান-পারিবারিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর চলমান চিকিৎসার তদারকির জন্য। এভাবে পারিবারিক চিকিৎসক হন-তাদের সকল চিকিৎসা সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে পারিবারিক চিকিৎসক হয়ে উঠেন এক একটি পারিবারের সকল ধরণের চিকিৎসা পরামর্শক ও বন্ধু।

বিশে^র প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান কোথায়? আমাদের স্বাস্থ্য খাতে অনেক অর্জন আছে। শিশু মৃত্যু হার, মাতৃ মৃত্যু হার কমানো ছাড়াও যক্ষা, ম্যালেরিয়া, HIV সংক্রমন অত্যন্ত সফলভাবে সীমিত করতে পেরেছি। কিন্তু পারিবারিক চিকিৎসক তৈরীর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাসহ, দীর্ঘ মেয়াদি রোগ, মানসিক রোগ ও অন্যান্য স্থানীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সুচারুরূপে শুরু করতে পারিনি। যার জন্য দরকার সাধারণ জনগনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সহ সুষ্ঠু রেফারাল পদ্ধতি সৃষ্টি করা। এ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট পরিমান পারিবারিক চিকিৎসক স্থানীয় ভাবে সহজলভ্য করা, প্রেসক্রিপসন ছাড়া কোন (ওটিসি ব্যতিত) মেডিসিন বিক্রি না করা, প্রেসক্রিপসন কারা করতে পারবে তা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া সহ ফার্মেসী, ল্যাবরেটরী ও ক্লিনিক নির্ধারিত নীতিমালা মেনে স্থাপন করার কঠোর আইন করা সহ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবী। সুষ্ঠু রেফারাল পদ্ধতি চালু করতে পারলে যেমন বিশেষজ্ঞ চেম্বারে অতিরিক্ত রোগীর বোঝা কমবে তেমনই হাসপাতালে অতিরিক্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যাও কমে যাবে। চিকিৎসক রোগী সম্পর্ক উন্নতির মাধ্যমে বর্তমানে চলমান আস্থাহীনতা ও বিদেশ মুখীতা ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হবে।

—————————————————

ডাঃ লে. কর্ণেল মোঃ কবীর আহমেদ খান (অবঃ)
কনসালটেন্ট ফ্যামিলী মেডিসিন, প্রাভা হেলথ।

Please follow and like us:

About bdsomoy