ব্রেকিং নিউজ

জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় অনভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবে ডুবছে চট্টগ্রামের বাদশা গ্রুপ

বাদশা অব ইন্ডাস্ট্রিজ। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি শিল্পগ্রুপ। এক দশক আগেও মূল ব্যবসা ছিল সাবান উৎপাদন ও বিপণন। এছাড়া ডেইরি প্রডাক্টের ব্যবসাও ছিল গ্রুপটির। পরে জাহাজ ভাঙা ও ট্রেডিং ব্যবসায় আসে। এর মধ্যে অতি মুনাফার লোভে জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় বড় বিনিয়োগ করে গ্রুপটি। কিন্তু ব্যবসায়িক অনভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবে এ ব্যবসায় সফল হতে পারেনি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে আটটি ব্যাংক প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করে বিপাকে পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসা বাদশার পারিবারিক মালিকানাধীন শিল্পগ্রুপ বাদশা অব ইন্ডাস্ট্রিজ। উনা পিতা বাকলিয়ার বাসিন্দা মরহুম বাদশা মিয়া সওদাগরের উদ্যোগে তালা মার্কা সাবান ব্যবসার মাধ্যমে এ গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় আসেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। বর্তমানে এ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে আযান লিমিটেড, এম এম এন্টারপ্রাইজ, ঝুমা এন্টারপ্রাইজ, বাদশা অয়েল মিলস অ্যান্ড সোপস ফ্যাক্টরি এবং মুসা অ্যান্ড ইসা ব্রাদার্স প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জাহাজ ভাঙার একটি প্রতিষ্ঠান ঝুমা এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণগুলো বেশিরভাগ খেলাপি। এর মধ্যে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংকে ১৫৬ কোটি টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ৫৬ কোটি টাকা। এছাড়া এ প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া মেঘনা ব্যাংকের ঋণও খেলাপির পথে আছে। পাশাপাশি ওয়ান ব্যাংক জুবলী রোড শাখায় ১৭০ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় ৭০ কোটি, এক্সিম ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় পাঁচ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে পাঁচ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকে পাঁচ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। বিপুল পরিমাণ ব্যাংক পাওনা রেখে মোহাম্মদ ইসা বাদশা এখন কানাডায় প্রবাসী।
সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এলাকার বাদশা মার্কেটে তৃতীয় তলায় বাদশা গ্রুপের বাণিজ্যিক অফিস। বেশ কয়েকটি টেবিল থাকলেও মাত্র একজন লোক অফিস করছেন। পরিচয় দিয়ে মালিক পক্ষের লোকজন অফিসে আসেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে আসেন, তবে নিয়মিত না।

ওই এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, শুনেছি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ভালো যাচ্ছে না। আসলে অতি লোভে তিনি জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। এর জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ নিয়েছেন, শুনেছি। যোগ্যতা না থাকায় লোকসানে পড়েন। পাশাপাশি বিপুল টাকার মধ্য থেকে কিছু পাচার করেন, আর কিছু টাকা দিয়ে মিডল্যান্ড ব্যাংকের মালিকানা, অর্থাৎ পরিচালক পদ নেন। তিনি এক বছর ধরে দেশে নেই। মনে হয় তিনি আর দেশে আসবেন না। তিনি তো পরিবার নিয়ে কানাডায় বসবাস করছেন।

বাদশা শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইসা বাদশার মালিকানাধীন ব্যবসায়িক অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করা হলে অফিস থেকে জানানো হয়, তিনি দেশে নেই। আর তার নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সংযোগটা বন্ধ পাওয়া যায়। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসা বাদশার মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান এম এম এন্টারপ্রাইজ এবং ঝুমা এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া ঋণ এখন খেলাপি। প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে পাওনা আছে ১৫৬ কোটি ৩৭ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩ টাকা। আর এ পাওনা আদায়ে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির চেষ্টা করা হলেও তা বিক্রি হয়নি, যা নিয়ে বিপাকে আছি আমরা।

শাহজালাল ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখাপ্রধান মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, গত মাসে ইসা বাদশার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে। আর এ পাওনা আদায়ে আইন অনুসারে বন্ধকিতে থাকা সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা যতটুকু জানি গত বছরের মে মাসের পর থেকে তিনি দেশে নেই। এসব খেলাপি গ্রাহকের কারণে তো আমাদের ব্যাংক খাতের এ অবস্থা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক  বলেন, আমাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ এখন খেলাপির পথে। আমি এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কয়েক মাস ধরে একাধিকবার যোগাযোগ করলে কোনো ধরনের সাড়া পাইনি। এসব লোক না বুঝে ব্যবসায় আসেন। এতে আমাদের ব্যাংক পরিচালনায় জটিলতা বাড়ে। শুনেছি তিনি এখনও ব্যাংক পরিচালক হিসেবে আছেন! এটা কীভাবে সম্ভব? নীতিনির্ধারকরা কী করেন?

উল্লেখ্য, মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক ইসা বাদশা। ব্যাংকটিতে ইসা ও তার অংশীজনদের নামে মোট পাঁচ শতাংশ শেয়ার আছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির অডিট কমিটির সদস্য তিনি।

Please follow and like us:

About bdsomoy