ব্রেকিং নিউজ

বয়ঃসন্ধিতে অভিভাবক ও পরিবারের করণীয়

চুপচাপ আনমনা বসে থাকে ১২ বছরের কিশোরী সুমাইয়া। কাউকে কিছু বলছে না। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়াও করছে না। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। কিছু বললে কিংবা খেতে ডাকলে রেগে উঠছে। বেশ কিছু দিন ধরে এমন আচরণ লক্ষ্য করছেন সুমাইয়ার মা। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালীন এ ধরনের আচরণ দেখা যায়। জীবনের এ সময়টাতে তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ শুরু হয়। এই বয়সে একজন ছেলে ও মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যা জীবনচক্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর তাই এই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বিষয়টি ভয় না পেয়ে আমাদের এ সকল বিষয় জানা জরুরি।

এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের মেয়েদের বয়ঃসন্ধিজনিত শারীরিক পরিবর্তন ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সের মধ্যে শুরু হয়। এ বয়সে মেয়েদের উচ্চতা বাড়ে। ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু তৈরি হয় এবং প্রতি মাসে ঋতুস্রাব শুরু হয়। প্রতি ২৮ দিনে এ ঋতুচক্র হয়ে থাকে। প্রত্যেক মাসের ঋতুচক্রের মাঝামাঝি সময়ে দুটি ডিম্বকোষের যেকোনো একটি থেকে একটি ডিম্বাণু নিঃসৃত হয় এবং এর ১৪ দিন পর ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। ছেলেদের ক্ষেত্রে বিকাশপর্বটি ১৪ থেকে ১৮ বছর। এ বয়সেই একটি ছেলের জীবনে প্রজনন ক্ষমতার সূচনা হয়। তার উচ্চতা বাড়ে। কাঁধ চওড়া হয়। কণ্ঠস্বর ভারী হয়। আর শুরু হয় শুক্রকোষ উৎপাদন। সময়ের পরিক্রমায় এক সময় ছেলেরা সাবালক হয়ে ওঠে। বয়ঃসন্ধিতে প্রজননেন্দ্রীয়ের পূর্ণবিকাশ হতে থাকে বলে এসময় ছেলেরা মেয়েদের প্রতি এবং মেয়েরা ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। তাদের শিক্ষা-দক্ষতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। তাই প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর সামাজিক অবস্থা বুঝে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকের, বিশেষ করে মায়ের বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীর আচরণের প্রতি সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সে কী চায়, কী ভাবছে, কী খায়, কখন ঘুমায়, কী পছন্দ করে, কী অপছন্দ করে, কাদের সাথে মিশে এমন সবক্ষেত্রে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে।

কিশোর-কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকালীন বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, টিনএজ ছেলেমেয়েরা নিজেদের প্রতি উদাসীন থাকে। তাই প্রতিটি অভিভাবকের উচিত এ সময় তাদের সন্তানদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেয়া। সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, এনার্জি লেভেল এবং অন্যান্য বডি প্রসেসে সাহায্য করে। কারণ এসময় তাদের শারীরিক বৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়। বয়স অনুয়ায়ী তাদের নিয়মিত সুষম খাবার দিতে হবে যাতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। বয়ঃসন্ধিকালে প্রতিদিন ফল ও সবজি, শস্যদানা, দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার এবং উচ্চমাত্রার প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। এর পাশাপাশি মাল্টি ভিটামিন খাওয়াও জরুরি। মাল্টি-ভিটামিন পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর দৈনিক ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। নিয়মিত ঘুম শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করে এবং বিষন্নতা কমায়। সময়মতো ঘুম থেকে না ওঠা বা ক্লাসে যেতে দেরি হবে এ অজুহাতে বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরী সকালের নাস্তা না করেই বের হয়ে যায়। সকালের স্বাস্থ্যসম্মত নাস্তা শরীরকে সারাদিন চলতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, নাস্তা না করলে মুটিয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে বেশি। তাই প্রতিদিন সকালে নাস্তা করতে হবে। নাস্তায় ফল, দুধ, ডিম, রুটি বা পরোটা, টোস্ট জাতীয় খাবার রাখার চেষ্টা করা উচিত। সবসময় ভারী খাবার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সামান্য ক্ষুধায় এক টুকরো ফল, কয়েকটি বাদাম, শসা বা ঘরে তৈরি যে কোন পুষ্টিকর হালকা খাবার খাওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যসম্মত যে কোনো খাবার কিশোর-কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকালীন শরীর সচল রাখে। এতে মনও থাকে সতেজ ও ফুরফুরে।

শরীর সুস্থ রাখতে খাদ্য তালিকা থেকে অতিরিক্ত মশলা ও তৈলাক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। বর্তমান সময়ে টিনএজদের মধ্যে তৈলাক্ত, ফাস্ট ফুড গ্রহণের প্রবণতা বেশি। ঘরে তৈরি খাবারের বদলে তাদের আকর্ষণ বাইরের বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, পিজা, চিপস, কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুেডর উপর। এসব খাবার হজম শক্তি কমিয়ে দেয়। এতে অনায়াসেই নানা রোগ শরীরে বাসা বাঁধে ।

কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন উচ্চতা, ফিজিক্যাল ফিটনেস ঠিক রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। এসময় টিনএজ ছেলেমেয়েরা টিভি দেখে, কম্পিউটার গেমস বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বেশিরভাগ সময় কাটায়। যা তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সুস্থতার জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি দিনে অন্তত এক ঘণ্টা হালকা ব্যায়াম করা ভালো। এ বয়সেই ছোট-খাট বাজে অভ্যাস ত্যাগ করা শেখাতে হবে। অন্যদের সামনে অযথা মাথা চুলকানো, নাকে হাত দেয়া, আঙুল ফোটানো, শব্দ করে হাঁচি-কাশি দেয়া, আড়মোড়া ভাঙার মতো দৃষ্টিকটু বদঅভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এসব আচরণ ব্যক্তিত্বকে খাটো করে।

কিশোর-কিশোরীদের জন্য বয়ঃসন্ধিকাল শেখার ও জানার সময়। নিজের জীবন সম্পর্কে, চারপাশের মানুষ, পরিবার ও পরিবেশকে জানার এটাই উত্তম সময়। নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে, ‘আমি পারবো, আমাকে পারতে হবে এমন প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হতে কিশোর-কিশোরীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’ এ দীপ্ত পথচলায় মাকেই হতে হবে সন্তানের আদর্শ বন্ধু।

Please follow and like us:

About bdsomoy