সোমবার, জুন ১৭, ২০২৪
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনযৌবনকাল জীবন সাজিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর সময়

যৌবনকাল জীবন সাজিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর সময়

যৌবনকাল জীবন সাজিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর সময়। মানুষ ছোটবেলায় যেমন অসহায় থাকে তেমনি বুড়ো বয়সেও সে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আর এ দুই দুর্বলকালের মাঝে যৌবনের অবস্থান। সেজন্যই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচটি বিষয়কে অন্য পাঁচটির আগে মূল্যবান ভেবে কাজ সেরে নাও। বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকালকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতার সময়কে, দারিদ্যে পড়ার আগে প্রাচুর্যকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে আর মৃত্যু আসার আগে তোমার জীবনকে। (হাকেম)

ইমাম আহমদ (রহ.) বলতেন, ‘যৌবনকাল হলো এমন এক বস্তু যা হাতের তালুতে রাখা ছিল কিন্তু পড়ে গেল। ইবাদতে সময় দেওয়ার উপযুক্ত কাল হচ্ছে তোমার যুবককালের দিনগুলো। তুমি কি জানো, যৌবনের দিনগুলো তোমার কাছে আগত মেহমানের মতো, খুব দ্রুত তা তোমার কাছ থেকে বিদায় নিবে। আর তাই যা করার তা যদি এখনি না করো, তবে অনুশোচনা তোমাকে দীর্ঘদিন দগ্ধ করবে।’

সাধে কি আর আল্লাহ কিয়ামতের মাঠে ঠায় দাঁড় করিয়ে এই নেয়ামতের কথা মনে করিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, তোমার যৌবনে তুমি কী করেছো? কোথায় কোন কাজে তা ব্যয় করেছো? (তিরমিযী)

আল্লাহর রাসুল (সা.) যে হাদীসে কিয়ামতের কঠিন মাঠে আরশের ছায়ায় অবস্থানকারীদের শ্রেণীবিভাগ করেছেন, তাতে তিনি ওই যুবকের কথাও এনেছেন যে তার যৌবনে আল্লাহর ইবাদত করতো।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন, মহান আল্লাহ যা কিছু ইলম ও ভালো দান করেন তা যৌবনকালেই করেন।

হাফসা বিনতে সীরীন বলেছেন, হে যুবা সম্প্রদায়! আমল যা করার তা তোমাদের এই যৌবনেই করে নাও।

আহনাফ বিন ক্বায়েস বলে গেছেন, যৌবনে যে নেতা হতে পারলো না, সে বার্ধক্যেও কিছু করতে পারে না।

ইতিহাসের পাতা সাক্ষি, রাসুল (সা.) এর অধিকাংশ সাহাবা যারা তাঁকে সর্বময় সাহায্য করেছিলেন এবং আপদে বিপদে বর্মের মতো তাঁকে আগলে রেখে পাশে ছিলেন, তাদের সবাই ছিলেন যার যার যৌবনের শীর্ষচূড়ায়। ওই যে দেখো, উসামাহ বিন যায়েদকে আল্লাহর নবী কাফেলার আমীর বানিয়ে পাঠাচ্ছেন অথচ তার বয়স মাত্র আঠার বছর।

আবার ওদিকে উততাব বিন উসায়েদকে আল্লাহর নবী (সা.) হুনাইন যাওয়ার আগে মক্কায় দায়িত্বশীল বানিয়ে রেখে যাচ্ছেন যখন তার বয়স বিশের কিছু বেশি।

শুধু কি তাই? দ্বীনের জন্য নানা যন্ত্রণা সহ্য করে যারা এ মশাল জ্বালিয়ে গেছেন আমাদের জন্য তাদের সবাই ছিলেন প্রায় তরুণ।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে ইমাম শাফেয়ীর গাধার পেছন পেছন হাঁটতে দেখে ইয়াহইয়া বিন মুয়ীন বললেন, কি ব্যাপার! আপনি শায়খ সুফিয়ানের হাদীস ও সনদ ছেড়ে এই যুবকের গাধার পেছনে ছুটছেন?

ইমাম আহমদ বললেন, শায়খ সুফিয়ানের হাদীস যদি উঁচু সনদ থেকে ছুটে যায়, তবে নীচের সনদ দিয়ে তা আমি পেতে পারি। কিন্তু এ যুবক চলে গেলে তা কোনো পর্যায়ের সনদে আমি পাব না।

একবার খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীযের কাছে এক প্রতিনিধিদল এলো ইরাক থেকে। ওই দলের একজন যুবককে কথা বলতে উৎসাহী দেখে উমর বিন আব্দুল আযীয বললেন, এই যে শোনো, বড়কে কথা বলতে দাও, বড়জনকে সুযোগ দাও। যুবক এ কথা শুনে আরয করলো, হে খলীফাতুল মুসলিমীন, ব্যাপার তো বয়সের নয়, যদি ইসলামে বয়সের কারণে সব জায়গায় অগ্রগণ্য হওয়ার বিধান থাকতো তবে মুসলমানদের মধ্যে অনেক লোক আপনার চেয়ে বয়সে প্রবীণ থাকা সত্ত্বেও আপনি তাদের খলীফা হতেন না। এমন জবাব শুনে খলীফা বললেন, হ্যা, ঠিক বলেছো। বলো, তুমি বলো।

শরহে মাক্বামাত কিতাবে মাসউদী বর্ণনা করেন, খলীফা মাহদী যখন বসরায় প্রবেশ করছিলেন তখন তিনি দেখলেন ইয়াস বিন মুআবিয়ার পেছনে প্রায় চারশ’ উলামায়ে কেরাম এবং বসরার নেতৃবৃন্দ হাঁটছেন অথচ ইয়াস তখনো তরুণ। এ দেখে মাহদী বলে উঠলেন, কি ব্যাপার, এই কাফেলায় কি আর কোনো প্রবীণ নেই যে তাদের আগে হেঁটে নেতৃত্ব দিতে পারে? তিনি ইয়াসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলে, তোমার বয়স কত? ইয়াস বলতে লাগলেন, আল্লাহ আপনার হায়াত দরাজ করুন, আমার এখন ওই বয়স চলছে যে বয়সে আল্লাহর নবী (সা.) উসামা বিন যায়েদকে কাফেলার আমীর বানিয়েছিলেন আর ঐ কাফেলায় হযরত আবু বকর ও উমর (রা.) এর মতো প্রবীন সাহাবারা শরীক ছিলেন। মাহদী বললেন, শাবাশ বেটা, যাও, এগিয়ে যাও।

তারিখে বাগদাদ নামীয় ইতিহাসের প্রশিদ্ধ গ্রন্থে রয়েছে, ইয়াহইয়া বিন আকসামকে বিশ বছর বয়সে যখন বসরা শহরের বিচারপতি হিসেবে সেখানে পাঠানো হল তখন স্থানীয়রা তাকে ছোট মনে করল এবং জিজ্ঞেস করে বসলো, আমাদের এই মহামান্য কাজীর বয়স কত হে!?

তিনি তাদের বললেন, শুনুন, আমি উততাব বিন উসায়েদের চেয়ে বয়সে বড় আর আল্লাহর নবী (সা.) আমার চেয়ে কম বয়সী থাকাকালে তাকে মক্কা বিজয়ের পর মক্কার বিচারপতি করেছিলেন, আমার চেয়ে কম বয়সেই মুআয বিন জাবালকে আল্লাহর নবী (সা.)  ইয়েমেনে বিচারকাজে পাঠিয়েছিলেন, আমার বয়স তো কা’ব বিন সুআইদ এর চেয়ে বেশি, তিনি আমার চেয়েও কম বয়সে এই বসরায় এসেছিলেন খলীফা উমরের বিচারপতি হিসেবে। বসরাবসী সবাই তার এ উত্তরে চমকিত হলো এবং তাকে মেনে নিলো।

আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদকে খুরাসানে গভর্ণর হিসেব যখন দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছিল তখন তার বয়স মাত্র তেইশ বছর।

আবু মুসলিম রাষ্ট্র এবং দাওয়াতের কাজ নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন যখন তার বয়স মাত্র একুশ। শায়খ ইবরাহীম নখয়ীর কাছে মানুষ ইলম শিখতে আসতো যখন তার বয়স মাত্র আঠার বছর। আর ইলমে নাহুর জন্য বিস্ময়কর কর্ম সাধন করে ইমাম সীবওয়াইহ এর ইন্তেকাল হলো মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে, অথচ এ সময়ে তিনি কতো কাজ করে গেলেন। (উলুওউল হিম্মাহ: শায়খ মুহাম্মদ ইসমাঈল মুকাদ্দিম)
যুবকরা জাতির মেরুদ-। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সম্মানের প্রাণশক্তি।

আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও কোনো আন্দোলন সফল হতে পারেনি যেখানে যুবক তরুণরা যায়নি। হালআমলে তাকিয়ে দেখি, বিশ্বের নানা সব বিস্ময়কর কর্মযজ্ঞ কি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যে একের পর এক জয় করে চলেছে তরুণরা। আমাদের জাতীয় কবির তারুণ্যের দিনগুলো পড়ে দেখি, যা কিছু লেখা ও গাওয়া, সবই তো ওই বয়সে তিনি করেছেন। যৌবনের গান শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন তার হৃদয়ের সবটুকু মমতা ও প্রাণময়তা উজাড় করে।

আমরাও এ সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হই, তাতেই আমাদের জীবনে সফলতার দেখা মিলবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ